চারপাশে এখন পরিবর্তনের চাপা গুঞ্জন। কিন্তু সেই গুঞ্জনের মাঝে কোথায় যেন একটা দীর্ঘশ্বাস আর হতাশার ছায়া খুব স্পষ্ট ভাবে মিশে আছে। দীর্ঘদিন ধরে যে বদলের স্বপ্ন সাধারণ মানুষকে দেখানো হয়েছিল, আজ যখন তার বাস্তবায়নের তোড়জোড় শুরু হতে চলেছে, তখন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ একটাই প্রশ্ন তুলছেন— “বড্ড দেরি হয়ে গেল না তো?” নিউজস্কোপ বাংলার একজন প্রতিবেদক হিসেবে মাঠে-ময়দানে ঘুরে মানুষের যে স্পন্দন আমি অনুভব করেছি, তাতে এই প্রশ্নের যৌক্তিকতা এড়ানো একেবারেই অসম্ভব। আজ আমরা খতিয়ে দেখব, ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান সময়ের এই বহু চর্চিত সংস্কারের অগ্নিপরীক্ষা।
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তব: কতটা দূরত্ব?
ভারত (India) নামক এই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় গণতান্ত্রিক দেশে যেকোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা নীতি বাস্তবায়িত হতে যে বিস্তর সময় লাগে, তা আমাদের সবারই জানা। রাজধানী নয়াদিল্লি (New Delhi) থেকে শুরু করে আমাদের পরিচিত কলকাতা (Kolkata) পর্যন্ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর ফাইলের পর ফাইল পেরিয়ে একটা নির্দেশিকা যখন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছায়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই তার আসল প্রয়োজনটাই ফুরিয়ে যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং কর্মসংস্থান— এই মূল স্তম্ভগুলোতে যে আমূল পরিবর্তনের কথা বছরের পর বছর ধরে বলা হচ্ছিল, তার গতি এতদিন ছিল রীতিমতো শ্লথ। এখন যখন হঠাৎ করেই প্রশাসনের টনক নড়েছে এবং তড়িঘড়ি বিভিন্ন দপ্তরে রদবদল বা নতুন নীতির প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে, তখন আমজনতার মনে সন্দেহ দানা বাঁধছে। এই তাড়াহুড়ো কি সত্যিই মানুষের মঙ্গলের জন্য, নাকি শুধুই ড্যামেজ কন্ট্রোল?
অগ্নিপরীক্ষার নেপথ্যে আসল কারণ কী?
কেন বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ আখ্যা দেওয়া হচ্ছে? কারণটা বুঝতে গেলে খুব একটা বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। দেশে লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি এবং বেকারত্ব এমন একটা ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মানুষের ধৈর্য্যের বাঁধ ইতিমধ্যেই ভাঙতে শুরু করেছে। একটা সময় ছিল যখন তরুণেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে মুম্বাই (Mumbai) বা বেঙ্গালুরুর (Bengaluru) মতো প্রথম সারির শহরগুলোতে পাড়ি জমাত। কিন্তু বর্তমানে সেখানেও সুযোগের আকাল দেখা দিয়েছে। ফলে ব্রেন ড্রেন বা মেধা পাচারের মতো মারাত্মক সমস্যা আমাদের অর্থনীতিকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দিচ্ছে। সরকার এখন যে কাঠামোগত সংস্কারের কথা বলছে, তা যদি অবিলম্বে ফলপ্রসূ না হয়, তবে মানুষের বুকে জমে থাকা এই ক্ষোভের আগুন নেভানো প্রশাসনের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
বিশ্বের আঙিনায় আমরা কোথায়?
আমরা যদি আমেরিকা (America) বা ব্রিটেন (Britain)-এর মতো উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকাই, দেখতে পাব সেখানে কোনো নীতির সামান্যতম ব্যর্থতা চোখে পড়লেই কত দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীন (China) বা এশিয়ার অন্যতম শক্তি জাপান (Japan)-এর প্রশাসনিক কাঠামোতেও সংস্কার একটা চলমান প্রক্রিয়া, কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আর আমাদের এখানে? সিস্টেমের গলদ বা রোগ নির্ণয় করতেই অর্ধেক সময় পেরিয়ে যায়। যখন ওষুধ দেওয়ার সময় আসে, ততক্ষণে রোগীর অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক।
দেরি কি সত্যিই হয়ে গেছে?
অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে সমাজতাত্ত্বিক— সমাজের বিশিষ্ট মহলের অনেকেই মনে করছেন, একদম খাদের কিনারে এসে হয়তো ঘুম ভেঙেছে নীতিনির্ধারকদের। যে কাজ আজ থেকে অন্তত পাঁচ বছর আগে শুরু হওয়া উচিত ছিল, তা আজ শুরু হচ্ছে। এর ফলে যে ক্ষতিটা হওয়ার, তা কিন্তু ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী কোভিডের পর থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই মূলধনের অভাবে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ বয়সের কোঠা পেরিয়ে যাওয়ার কারণে সরকারি চাকরির দৌড় থেকে পাকাপাকিভাবে ছিটকে গেছেন। তাঁদের কাছে আজকের এই নতুন সংস্কার বা প্যাকেজ ঘোষণার আক্ষরিক অর্থেই আর কোনো দাম নেই। তাঁদের জীবনের অমূল্য সময়গুলো তো আর কোনো সংস্কারই ফিরিয়ে দিতে পারবে না।


Recent Comments