রাজ্যের রাজনৈতিক পারদ এখন তুঙ্গে। দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে ২০২৬ সালের হাইভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচন। আর এই মেগা নির্বাচনের রণাঙ্গনে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে রণকৌশল চূড়ান্ত করে ফেলেছে রাজ্যের বর্তমান শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)। আজ দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাটের (Kalighat) নিজস্ব বাসভবনের সেই পরিচিত ‘পয়া’ প্রেসরুম থেকেই প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করতে চলেছেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের তালিকায় নবীন ও প্রবীণের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যেতে পারে। ইতিমধ্যেই দলনেত্রীর বাসভবনে পৌঁছে গিয়েছেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। ২৯৪টি আসনের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের অপেক্ষায় এখন প্রহর গুনছে গোটা পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)। নিউস্কোপ বাংলার (Newscope Bangla) নিজস্ব রাজনৈতিক সংবাদদাতাদের সূত্র মারফত উঠে আসছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য।
দুই ২৪ পরগনায় বিশেষ নজর ও ভাঙড় সমীকরণ রাজ্য রাজনীতির অন্দরমহলে কান পাতলেই শোনা যায়, বাংলার মসনদ দখলের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা (North 24 Parganas) এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা (South 24 Parganas) জেলা দুটিতে। এই দুই জেলা মিলিয়ে মোট ৬৪টি বিধানসভা আসন রয়েছে। অঙ্কের সহজ হিসেব বলছে, এই আসনগুলির সিংহভাগ যে দলের দখলে থাকবে, বঙ্গ বিজয়ের পথে তারাই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে যাবে। শাসক শিবিরের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত এই দুই জেলায় বরাবর চুলচেরা হিসেব করেই প্রার্থী বাছাই করা হয়। ছাব্বিশের ভোটেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় (Bhangar) কেন্দ্রটি। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনটিতে জয়ী হয়েছিলেন আইএসএফ (ISF) নেতা নওশাদ সিদ্দিকি (Naushad Siddiqui)। একমাত্র এই বিরোধী আসনটি পুনরুদ্ধারে এবার মরিয়া শাসক শিবির। সূত্রের খবর, নওশাদকে কড়া টেক্কা দিতে ক্যানিং পূর্বের (Canning East) দাপুটে বিধায়ক শওকত মোল্লাকে (Saokat Molla) এবার ভাঙড়ের ময়দানে নামানোর সম্ভাবনা প্রবল।
বেহালায় রদবদল, পার্থর জায়গায় কে? কলকাতার রাজনীতির অন্যতম ভরকেন্দ্র বেহালা (Behala)। সূত্রের খবর, এবার বেহালা পশ্চিমে বড়সড় রদবদল আসতে চলেছে। এই কেন্দ্রের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক এবং প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় (Partha Chatterjee) শিক্ষা দুর্নীতি মামলায় বর্তমানে জেলবন্দি। স্বাভাবিকভাবেই দল তাঁর সঙ্গে দূরত্ব অনেকটাই বাড়িয়ে নিয়েছে। শোনা যাচ্ছে, পার্থকে আর টিকিট দেওয়া হবে না। তাঁর বদলে পুরনো কেন্দ্র পরিবর্তন করে রত্না চট্টোপাধ্যায়কে (Ratna Chatterjee) বেহালা পশ্চিমের প্রার্থী করা হতে পারে। অন্যদিকে, বেহালা পূর্ব (Behala East) কেন্দ্র থেকে টিকিট পেতে পারেন অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক শুভাশিস চক্রবর্তী (Subhasish Chakraborty)।
পাশাপাশি শহরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলিতেও থাকছে চমক। বালিগঞ্জ (Ballygunge) কেন্দ্রে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় (Sobhandeb Chattopadhyay) এবং বারাসত (Barasat) থেকে সব্যসাচী দত্তের (Sabyasachi Dutta) নাম জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে। এন্টালি (Entally) কেন্দ্রে সন্দীপন সাহার (Sandipan Saha) ওপরই হয়তো ভরসা রাখছে দল।
গ্ল্যামার ও রাজনীতির যুগলবন্দি শাসকদলের প্রার্থী তালিকায় সবসময়ই তারকামুখের এক বিশেষ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এবারও সেই ধারায় কোনও ছেদ পড়ছে না। জল্পনা ছড়িয়েছে যে, টলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রখ্যাত অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় (Parambrata Chatterjee) আজই আনুষ্ঠানিকভাবে জোড়াফুল শিবিরে যোগ দিতে পারেন এবং তাঁকে কোনও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র থেকে নির্বাচনী ময়দানে নামানো হতে পারে।
এছাড়াও বর্তমান বিদায়ী বিধায়ক ও অভিনেতা সোহম চক্রবর্তীকে (Soham Chakraborty) চণ্ডীপুর থেকে সরিয়ে নদিয়া জেলার করিমপুর (Karimpur) থেকে টিকিট দেওয়া হতে পারে বলে খবর মিলেছে। তবে সোনারপুর দক্ষিণে (Sonarpur South) অভিনেত্রী লাভলি মৈত্রর (Lovely Moitra) ওপরই ফের আস্থা রাখছে শীর্ষ নেতৃত্ব।
নন্দীগ্রামে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ পূর্ব মেদিনীপুরের হাইভোল্টেজ কেন্দ্র নন্দীগ্রাম (Nandigram) নিয়ে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল নিচ্ছে ঘাসফুল শিবির। এখানকার বর্তমান বিধায়ক এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে (Suvendu Adhikari) তাঁর নিজের গড়েই ধরাশায়ী করতে ‘ভূমিপুত্র’ তাস খেলতে চলেছে দল। সূত্রের খবর, ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার’ নীতি গ্রহণ করে বয়ালের বাসিন্দা তথা একদা শুভেন্দু ঘনিষ্ঠ নেতা পবিত্র করকে (Pabitra Kar) এবার নন্দীগ্রামের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে।
নতুন যোগদান এবং বিরোধীদের অবস্থান প্রার্থী তালিকা ঘোষণার ঠিক আগেই দলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যোগদান সম্পন্ন হয়েছে। প্রাক্তন ক্রিকেটার শিবশংকর পাল (Shivshankar Paul), ঝাড়গ্রামে (Jhargram) সাধু রামচান মুর্মু বিশ্ববিদ্যালয়ের ল অফিসার মঙ্গল সোরেন (Mangal Soren) এবং কৃষ্ণনগরে (Krishnanagar) সমাজসেবী অভিনব ভট্টাচার্য (Abhinav Bhattacharya) শাসকদলে নাম লিখিয়েছেন।
ইতিমধ্যেই বামফ্রন্ট (Left Front) ১৯২টি আসনে এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপি (BJP) ১৪৪টি আসনে তাদের আংশিক প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে দিয়েছে। তবে সকলের নজর এখন শুধুই কালীঘাটের দিকে। কারণ এখান থেকেই নির্ধারিত হতে চলেছে আগামী পাঁচ বছর বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রের রূপরেখা।

Recent Comments