পঁচিশ শতাংশ শুল্ক বা Tariff তুলে নেওয়ার ঘোষণায় ভারত (India)-র বাণিজ্য মহলে স্বস্তির হাওয়া বইছিল ঠিকই, কিন্তু সেই স্বস্তি কি দীর্ঘস্থায়ী হবে? ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর সই করা নির্দেশের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক ‘বিপজ্জনক শর্ত’ এখন বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। আপাতদৃষ্টিতে বন্ধুত্বের বার্তা মনে হলেও, এই নির্দেশের ছত্রে ছত্রে রয়েছে ভারতের ওপর কড়া ‘নজরদারি’র ইঙ্গিত। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানি (Brahma Chellaney)-র মতে, আমেরিকা (US) আসলে এক হাতে মিষ্টি দিয়ে অন্য হাতে চাবুক উঁচিয়ে রেখেছে।
‘নজরদারি’র গোপন শর্ত: শুল্ক প্রত্যাহারের নির্দেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে, মার্কিন বাণিজ্য সচিব বা Commerce Secretary-কে নিয়মিত Track করতে হবে যে ভারত (India) কোনোভাবেই রাশিয়া (Russia) থেকে তেল আমদানি করছে কি না। ব্রহ্মা চেলানি (Brahma Chellaney) সতর্ক করে জানিয়েছেন, নির্দেশে ব্যবহৃত “Indirectly” বা পরোক্ষভাবে শব্দটি ভারতের জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে। এর অর্থ হলো, ভারত (India) যদি রাশিয়ান ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে ডিজেল বা জেট ফুয়েল হিসেবে ইউরোপ (Europe) বা অন্য কোথাও রপ্তানি করে, তবে সেটিও শাস্তির আওতায় পড়বে। আর বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি হলেই ফিরে আসবে সেই ২৫% শুল্কের খড়গ।
অর্থনৈতিক জবরদস্তি বা ‘Coercion’? বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে ওয়াশিংটন (Washington)-এর এক ধরনের অর্থনৈতিক জবরদস্তি। সস্তা রাশিয়ান তেলের দরজা বন্ধ করে ভারতকে বাধ্য করা হচ্ছে আমেরিকা (US) থেকে চড়া দামে তেল ও গ্যাস কিনতে। চেলানির হিসেব অনুযায়ী, এর ফলে ভারতের তেল আমদানির খরচ বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা) বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, “ওয়াশিংটন (Washington) চাইছে ভারতের এনার্জি বাস্কেট বা জ্বালানি নিরাপত্তাকে পুরোপুরি তাদের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে, যা ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক—উভয় দিক থেকেই ভারতের জন্য ব্যয়বহুল।”
দিল্লির নীরবতা ও কৌশলী অবস্থান: বিষয়টি নিয়ে ভারত সরকার এখনও কোনো স্পষ্ট ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলেনি। বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল (Piyush Goyal) প্রশ্নটি এড়িয়ে গিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রকের দিকে বল ঠেলে দিয়েছেন। মন্ত্রক জানিয়েছে, ভারত তার এনার্জি বাস্কেট বা তেলের উৎস বৈচিত্র্যময় (Diversify) করবে বাজার দর এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। তবে রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয় রিফাইনারিগুলো ইতিমধ্যেই এপ্রিল মাসের জন্য রাশিয়া (Russia) থেকে তেল কেনার অর্ডার দেওয়া বন্ধ রেখেছে।
বাণিজ্য ঘাটতির আশঙ্কা: নতুন ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরে ভারতকে আমেরিকা (US) থেকে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য (মূলত Energy ও Defense) কিনতে হবে। এর ফলে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বা Trade Deficit বেড়ে দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চেলানি মনে করছেন, ট্রাম্পের এই নীতি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর চেয়েও বেশি আগ্রাসী।
এখন প্রশ্ন হলো, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বা Strategic Autonomy বজায় রেখে মোদী সরকার কীভাবে এই মার্কিন চাপ সামলায়? তেলের দামে আগুন লাগার আগেই কি কোনো কূটনৈতিক সমাধান মিলবে?
