মধ্যপ্রাচ্যে (Middle East) যুদ্ধের দামামা যেন থামার কোনো লক্ষণই নেই। এবার সরাসরি ইরানের (Iran) বুকে তীব্র আঘাত হানল ইজরায়েল (Israel)। রাজধানী তেহরান (Tehran) সহ দেশের একাধিক সামরিক ঘাঁটিতে চালানো হয়েছে ভয়াবহ বিমান হামলা। রাতের অন্ধকার চিরে মুহুর্মুহু বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠেছে গোটা শহর। তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর এবং উদ্বেগের বিষয় হলো, এই হামলার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের (Ayatollah Ali Khamenei) দপ্তরের খুব কাছাকাছি এলাকা। আর এই ভয়ংকর ঘটনার পর থেকেই গোটা বিশ্বজুড়ে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে— কোথায় আছেন ইরানের সুপ্রিম লিডার? তিনি কি আদৌ সুরক্ষিত?
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর রিপোর্ট অনুযায়ী, ইজরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালিয়েছে। মূলত ইরানের (Iran) military এবং air defense সিস্টেমগুলোকে লক্ষ্য করেই এই আক্রমণ শানানো হয়। গত পয়লা অক্টোবর ইরান (Iran) যে প্রায় দুশোটি ব্যালিস্টিক missile ছুঁড়েছিল ইজরায়েলের (Israel) দিকে, এই হামলাকে তারই সরাসরি জবাব বলে দাবি করছে ইজরায়েলি সামরিক বাহিনী। তেহরানের (Tehran) পাশাপাশি খুজেস্তান (Khuzestan) এবং ইলাম (Ilam) প্রদেশেও আঘাত হানা হয়েছে। ইজরায়েল (Israel) দাবি করেছে, তারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ইরানের drone ও missile তৈরির কারখানাগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
এই ভয়াবহ যুদ্ধ-পরিস্থিতির মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের (Ayatollah Ali Khamenei) অবস্থান। আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সূত্র এবং একাধিক পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, হামলার আঁচ পেতেই সুপ্রিম লিডারকে তেহরানের (Tehran) বাসভবন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাকে দেশের ভেতরেরই কোনো এক অজানা এবং অত্যন্ত secure বাঙ্কারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই কড়াকড়ি করা হয়েছে যে, হাতেগোনা কয়েকজন শীর্ষ আধিকারিক ছাড়া কেউ তার আসল অবস্থান জানেন না। এর আগে যখন হামাস (Hamas) এবং হিজবুল্লাহর (Hezbollah) শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা হয়েছিল, তখনও খামেনেইকে (Khamenei) একইভাবে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। ইজরায়েল (Israel) যে যেকোনো মুহূর্তে শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর target killing চালাতে পারে, সেই প্রবল ভয় থেকেই এই চরম সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।
এই হামলার ক্ষেত্রে আমেরিকা (America) বা ইউনাইটেড স্টেটস (United States) এর ভূমিকাও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও ওয়াশিংটন (Washington) দাবি করেছে যে তারা সরাসরি এই হামলায় অংশগ্রহণ করেনি, তবে ইজরায়েল (Israel) আক্রমণ চালানোর আগে মার্কিন প্রশাসনকে বিষয়টি অবহিত করেছিল। আমেরিকার (America) তরফ থেকে বারবার উত্তেজনা কমানোর কথা বলা হলেও, ইজরায়েল (Israel) নিজেদের আত্মরক্ষার খাতিরে এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে সাফ জানিয়েছে। অন্যদিকে, ইরান (Iran) এই হামলার তীব্র নিন্দা করে জানিয়েছে, তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করার চরম মূল্য চোকাতে হবে ইজরায়েলকে (Israel)।
সাধারণ নাগরিকদের জীবনে এই সংঘাতের প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। রাতের বেলা যখন প্রথম বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, তখন তেহরানের (Tehran) বাসিন্দারা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। হঠাৎ সাইরেনের শব্দ এবং পরপর বোমার আওয়াজে তারা আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। অনেকেই social media-তে সেই ভয়ংকর রাতের ভিডিও শেয়ার করেছেন। শিশুদের কান্না আর মায়েদের আর্তনাদে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ শুধু সামরিক নয়, মানসিক দিক থেকেও সাধারণ মানুষকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক sanctions এবং তার ওপর এই যুদ্ধের কালো মেঘ— সব মিলিয়ে ইরানের (Iran) সাধারণ মানুষের জীবন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu) স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, যারা ইজরায়েলের (Israel) ক্ষতি করার চেষ্টা করবে, তাদের কাউকে রেয়াত করা হবে না। এই আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের (Middle East) ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন এবং ভয়ংকর অধ্যায়ের সূচনা করল। এতদিন পর্যন্ত ইরান (Iran) এবং ইজরায়েল (Israel) মূলত proxy যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তারা সরাসরি একে অপরের ভূখণ্ডে হামলা চালাচ্ছে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে গোটা অঞ্চলকে ঠেলে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের মনে একটাই আতঙ্ক, এই সংঘাত যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তবে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি এবং তেলের বাজারে এক বিশাল প্রভাব পড়বে।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত থমথমে। তেহরানের (Tehran) রাস্তায় সাধারণ মানুষের চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। যদিও ইরানের (Iran) সরকার দাবি করেছে যে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে এবং খুব সামান্যই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবুও খোদ সুপ্রিম লিডারের দপ্তরের কাছে এমন হামলা তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল। এখন দেখার বিষয়, ইরান (Iran) এই হামলার কী জবাব দেয়। কারণ তাদের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের (Middle East) এবং গোটা বিশ্বের ভবিষ্যৎ শান্তি।
