ই মুহূর্তে বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত খবর হল আমেরিকা (America) ও ইরান (Iran) সংঘাত। নয় নয় করে পঞ্চম দিনে পদার্পণ করল আমেরিকা (America), ইজরায়েল (Israel) এবং ইরান (Iran)-এর এই ভয়াবহ যুদ্ধ। এই মুহূর্তে গোটা পশ্চিম এশিয়া (West Asia) জুড়ে যেন বারুদের গন্ধ। একদিকে যেমন ইরান (Iran)-এর বুকে একের পর এক শক্তিশালী হামলা চালাচ্ছে আমেরিকা (America), তেমনই পাল্টা আঘাত হানতে পিছপা হচ্ছে না ইরান (Iran)। কিন্তু এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে আমেরিকা (America)-র ঠিক কত পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে এবং কী পরিমাণ সামরিক সম্পত্তি নষ্ট হচ্ছে? আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা সেই হিসাবই তুলে ধরব।
যুদ্ধ খাতে বিপুল আর্থিক ব্যয় প্রথমেই আসা যাক খরচের পরিসংখ্যানে। যুদ্ধ কখনও সস্তা হয় না, আর এই সংঘাত তো রীতিমতো রাজকোষ খালি করার জোগাড় করেছে। জানা গিয়েছে, ইরান (Iran)-এর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নামার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আমেরিকা (America)-র খরচ হয়েছে প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। Center for New American Security-র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র যুদ্ধবিমান বহনকারী জাহাজগুলিকে সমুদ্রে সক্রিয় রাখতেই দৈনিক প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে। যুদ্ধের আগেই সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করতে প্রায় ৫ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
আমেরিকা (America)-র প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) ইতিমধ্যেই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, প্রয়োজনে এই যুদ্ধ সারা জীবন চলতে পারে। কিন্তু এর অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা গভীর? Penn Wharton Budget Model-এর ডিরেক্টর কেন্ট স্মেটার্স (Kent Smetters) মনে করছেন, সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে আমেরিকা (America)-র কোষাগার থেকে ২১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেরিয়ে যেতে পারে, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৮.৮৭ লক্ষ কোটি টাকা। বর্তমানে ইরান (Iran)-এ অভিযান চালাতে গিয়ে দৈনিক ৫৯.৩৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে।
সামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি সামরিক ক্ষয়ক্ষতিও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত রবিবার কুয়েত (Kuwait)-এ থাকা আমেরিকা (America)-র সেনাঘাঁটিতে এক বড়সড় হামলা চালায় ইরান (Iran)। এই দুর্ভাগ্যজনক হামলায় ৬ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে চারজনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে— ক্যাপ্টেন কোডি খর্ক (Cody Khork), সার্জেন্ট নোয়া টিটজেন্স (Noah Tietjens), সার্জেন্ট নিকল আমোর (Nicole Amor) এবং সার্জেন্ট ডিক্ল্যান কোয়াডি (Declan Coady)।
New York Times-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ইরান (Iran) শুধুমাত্র কুয়েত (Kuwait)-এর তিনটি ঘাঁটিতেই নয়, বরং বাহরাইন (Bahrain), ইরাক (Iraq) এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি (United Arab Emirates)-তেও হামলা চালিয়েছে। বাহরাইন (Bahrain)-এর মানামা (Manama)-তে নৌবাহিনীর ঘাঁটির রাডার ব্যবস্থা এবং যোগাযোগের মাধ্যম সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, কুয়েত (Kuwait)-এর বায়ুসেনা ঘাঁটির ড্রোন শেল্টারগুলি এবং একাধিক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ক্যাম্প বুয়েরিং (Camp Buehring)-এর উপরেও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গিয়েছে।
এছাড়াও, ইরাক (Iraq)-এর এরবিল (Erbil) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ফলে চারটি ভবন সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে গিয়েছে। দুবাই (Dubai)-এর জেবেল আলি (Jebel Ali) বন্দর এবং কাতার (Qatar)-এর আল-উদেইদ (Al Udeid) বায়ুসেনা ঘাঁটিতেও হামলার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
যুদ্ধের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট এই সংঘাতের সূত্রপাত এবং ব্যাপ্তি বুঝতে গেলে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে হামাস (Hamas) এবং ইজরায়েল (Israel)-এর মধ্যে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার প্রভাব গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। আমেরিকা (America) প্রথম থেকেই ইজরায়েল (Israel)-কে সমর্থন জুগিয়ে আসছে এবং এযাবৎ প্রায় ২১.৭ বিলিয়ন ডলার সাহায্য করেছে। এর পাশাপাশি ইয়েমেন (Yemen) এবং অন্যান্য অঞ্চলে অভিযান চালাতেও প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়েছে। Brown University-র সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে এই সমস্ত যুদ্ধ খাতে আমেরিকা (America)-র মোট খরচ ২.৮২ থেকে ৩.০৪ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে।
সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়া (West Asia)-র এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একদিকে অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে সেনার মৃত্যু ও সামরিক সম্পত্তির ক্ষতি— আমেরিকা (America)-র জন্য এই যুদ্ধ এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী দিনে এই সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার।
