
সম্পাদকীয়, তপোব্রত ঘোষ
ভারতের প্রজাতন্ত্রের ইতিহাস কোনো তারিখের হিসাব নয়। এটি রক্ত, চোখের জল, খিদে আর আশার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা মানুষের বাঁচতে চাওয়ার গল্প। শতাব্দীর পর শতাব্দী এই দেশের মানুষ শাসিত হয়েছে—কখনো সম্রাটের নামে, কখনো ধর্মের নামে, কখনো বিদেশি শক্তির শোষণের নাম নিয়ে। সাধারণ মানুষের কণ্ঠ ছিল প্রতিবাদহীন পরিচয় ছিল গৌণ। সেই নীরবতার দীর্ঘ রাত ভেঙে আলো এসেছে দেরিতে।
১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা তাই শেষ নয়, বরং শুরু। কারণ স্বাধীন হলেও ভারত তখনো নিজের নয়—রাষ্ট্রপ্রধান তখনো ব্রিটিশ রাজা। সেই শূন্যতার ভেতর দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ বিশ্বাস করেছিল, এই বিশাল জনসমুদ্র নিজেই নিজের ভাগ্য লিখতে পারবে। সেই বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয় সংবিধান প্রণয়নের স্বপ্ন। ড. বি. আর. আম্বেদকর, যিনি নিজেই বৈষম্যের গভীর ক্ষত বয়ে বেড়াতেন, তিনিই কলম ধরেন সেই সংবিধানের—যাতে কেউ আর জন্মের কারণে নিচু না হয়।
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারত নিজেকে প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। এই দিনটি কেবল একটি রাষ্ট্রীয় ঘোষণা নয়—এটি ছিল একজন সাধারণ কৃষক, একজন না খেতে পাওয়া শ্রমিক, একজন শোষিত দলিত, একজন অত্যাচারিত নারীর কাছে পৌঁছে যাওয়ার নীরব আশ্বাস। শিক্ষিত না হয়েও সবাই পেল ভোটাধিকার। ইতিহাসে বিরল এই সিদ্ধান্ত ছিল মানুষের ওপর এক অকুণ্ঠ আস্থা—যেন বলা হলো, এই দেশ শুধু তোমারই দেশ।
ভারতীয় প্রজাতন্ত্র নিখুঁত নয়। জরুরি অবস্থা এসেছে, রাস্তায় রক্ত পড়েছে, ধর্মের নামে মানুষ মানুষকে আঘাত করেছে। সংবিধানের পাতায় লেখা আদর্শ আর বাস্তব জীবনের ব্যবধান বহুবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে ব্যর্থতা। তবু প্রতিবারই মানুষ ফিরে গেছে সেই সংবিধানের কাছেই—আদালতের দরজায়, ব্যালট বাক্সের সামনে, কিংবা নিঃশব্দ প্রতিবাদের ভেতর দিয়ে।
এই প্রজাতন্ত্র তাই শুধু আইন নয়, অনুভূতি। এটি ভাঙে, আবার জোড়া লাগে। ভুল করে, আবার শেখে। ভারতের প্রজাতন্ত্র বেঁচে আছে থাকবে ও ততদিন,যতদিন মানুষ প্রশ্ন করবে, প্রতিবাদ করবে, স্বপ্ন দেখবে।

