বছর পেরিয়ে গেলেও আমানতকারীদের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়া এখনও বিশবাঁও জলে। রোজ ভ্যালি (Rose Valley) চিটফান্ড কাণ্ডে টাকা ফেরতের গতিপ্রকৃতি এবং এ ডি সি কমিটি (ADC Committee) ও সেবি (SEBI)-র হিসাব নিয়ে এবার বড়সড় প্রশ্ন উঠে গেল। কোটি কোটি টাকার এই লেনদেনে অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলে এবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে আমানতকারীদের সংগঠন। এই মামলার গুরুত্ব বিচার করে কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) মাননীয় বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজ (Justice Rajarshi Bharaddaj) এবং বিচারপতি উদয় কুমার-এর (Justice Uday Kumar) ডিভিশন বেঞ্চ (Division Bench) ইতিপূর্বেই হস্তক্ষেপ করেছে।
কেন থমকে আছে টাকা ফেরতের কাজ?
মামলার শুনানিতে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। আদালত সূত্র খবর, এ ডি সি কমিটির অ্যাকাউন্টগুলোর Forensic Audit রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল Serious Fraud Investigation Office (SFIO)-কে। কিন্তু অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরেও সেই রিপোর্ট জমা দিতে পারেনি কেন্দ্রীয় এই সংস্থাটি। ফের একবার আদালতের কাছে অতিরিক্ত এক মাস সময় চেয়ে নিয়েছে তারা। এই রিপোর্ট না আসার কারণে আমানতকারীদের টাকা ফেরানোর আইনি প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ধীর গতিতে টাকা বিলি এবং সাধারণের ক্ষোভ :
গত ৪ঠা অক্টোবর, ২০২৪ থেকে রোজ ভ্যালির টাকা বিলির প্রক্রিয়া শুরু হলেও তার গতি অত্যন্ত শ্লথ। আমানতকারীদের সংগঠন All Bengal Chitfund Sufferers Welfare Association-এর দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য পরিমাণে টাকা বরাদ্দ করা হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের জমা করা কষ্টের টাকা কবে সম্পূর্ণভাবে ফেরত পাওয়া যাবে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। সংগঠনের রাজ্য সভাপতি রূপম চৌধুরী (Rupam Chowdhury) কেন্দ্রীয় সরকারের Corporate Affairs Ministry-র ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, বিষয়টি নিয়ে সরকারি স্তরে এক রহস্যময় নীরবতা পালন করা হচ্ছে।
স্বাধীনতার পর বৃহত্তম আর্থিক কেলেঙ্কারি
১৯৯০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) সহ সারা ভারত (India) জুড়ে চিটফান্ড সংস্থাগুলো যে লুটতরাজ চালিয়েছে, তাকে ভারতের স্বাধীনতার ৬৬ বছর পরবর্তী সময়ের বৃহত্তম কেলেঙ্কারি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছেপশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৫ কোটি মানুষের কাছ থেকে ৪ লাখ কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। দেশের অন্যান্য প্রান্তের আরও ৩০ কোটি মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে এই সংস্থাগুলো।অভিযোগের তির শুধুমাত্র সংস্থার কর্ণধারদের দিকেই নয়, বরং দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সরকারের দিকেও। আমানতকারীদের অভিযোগ, দিনের পর দিন এই বিশাল পরিমাণ অর্থ লুট হলেও প্রশাসন ছিল কার্যত নির্বিকার।
সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) এবং বিভিন্ন হাইকোর্টে চলা মামলাগুলোতেও বারবার রাজনৈতিক যোগসূত্র প্রমাণিত হয়েছে।বৃহত্তর আন্দোলনের ডাকগত ১২ বছর ধরে রাজপথ এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষতিগ্রস্তদের সংগঠন। আগামী দিনে এই আন্দোলনকে আরও তীব্র করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে:
১. মার্চ মাসের শুরুতে কলকাতায় (Kolkata) একটি বিশাল জনশুনানির আয়োজন করা হবে।
২. মার্চ মাসের শেষ দিকে প্রতিটি জেলায় জেলায় অবস্থান এবং ধরনা কর্মসূচি চলবে।
৩. দাবি পূরণ না হলে কলকাতার রাস্তায় হাজার হাজার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে নিয়ে ধারাবাহিক গণ-আইন অমান্য আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আমানতকারীরা আশা করেছিলেন দ্রুত টাকা ফেরত পাবেন। কিন্তু SFIO-র রিপোর্ট দাখিলের টালবাহানা সেই আশায় কার্যত জল ঢেলে দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী এক মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা আদালতের নির্দেশ পালন করে কি না।

