
বঙ্কিম-ভবন গবেষণা কেন্দ্র, ১৪-৮-২৬/১
আমরা কি সবাই জানি মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদশাস্ত্রী সি.আই.ই, এফআরএএস-এর (৬ ডিসেম্বর, ১৮৫৩ – ১৭ নভেম্বর, ১৯৩১) আসল নাম ছিল হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য? ভারততত্ত্ববিদ, সংস্কৃত বিশারদ, সংরক্ষণবিদ ও বাংলা সাহিত্যের এই ইতিহাস রচয়িতা। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের আবিষ্কর্তা। তিনি সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত রামচরিতম্ বা রামচরিতমানস পুঁথির সংগ্রাহক।


গ্যালারিতে অর্ধেকটা জুড়ে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, বাকি অর্ধেকটায় সমরেশ বসু (১১ ডিসেম্বর ১৯২৪ – ১২ মার্চ ১৯৮৮)। তাঁর শৈশব কাটে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে আর কৈশোর কাটে কলকাতার উপকণ্ঠ নৈহাটিতে। বিচিত্র সব অভিজ্ঞতায় তাঁর জীবন ছিল পরিপূর্ণ। তিনি একসময় মাথায় ফেরি করে ডিম বেচতেন।

১৯৫৯ সালে সমরেশ বসু আনন্দ পুরস্কার পান “শ্রীমতী কাফে” উপন্যাসের জন্য। কালকূট ছদ্মনামে লেখা “শাম্ব” উপন্যাসের জন্য ১৯৮০ সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান। সেরা কাহিনী রচয়িতা হিসেবে ফিল্মফেয়ার
পুরস্কার পান। তিনি ১৯৮৫ সালে সন্তোষকুমার ঘোষ স্মৃতি পুরস্কার এবং ১৯৮৬ সালে এশিয়ান পেইন্টস এর পক্ষ থেকে “শিরোমণি পুরস্কার” পেয়েছেন। “দেখি নাই ফিরে” উপন্যাসের জন্য ১৯৯৩ সালে মরণোত্তর আনন্দ পুরস্কার পান সমরেশ বসু। গ্যালারিতে তাঁর বিভিন্ন সময়ের জীবন, পরিবার, বইয়ের প্রচ্ছদ প্রভৃতি প্রায় ৪০টি বাঁধানো ছবি।

কালকূট মানে তীব্র বিষ। এটি ছিল তাঁর ছদ্মনাম। বহমান সমাজ থেকে বাইরে গিয়ে একান্তে বেড়াতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আর সে অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন ভ্রমণধর্মী উপন্যাস। হিংসা, মারামারি আর লোলুপতার বেড়াজালে আবদ্ধ থেকে যে জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তিনি অমৃতের সন্ধান করেছেন। তাই কালকূট নাম ধারণ করে হৃদয়ের তীব্র বিষকে সরিয়ে রেখে অমৃত মন্থন করেছেন উপন্যাসের মধ্য দিয়ে৷ উইকিপিডিয়ার তথ্য জানাচ্ছে ৪টি সংকলন, অসমাপ্ত ও অগ্রন্থিত ধরে এই ছদ্মনামে তাঁর বইয়ের সংখ্যা ৩৮। গবেষণা কেন্দ্রের হেফাজতে রয়েছে কালকূটের ‘কোথায় পাব তারে’-র মূল পাণ্ডুলিপি। তার তিনটি পৃষ্ঠা কাঁচের শো কেসে।

ভবনের একতলায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রও ও সমরেশ বসুর নামাঙ্কিত গ্যালারির পাশে ‘বন্দেমাতরম কক্ষ’। প্রায় ৬৫টি বাঁধানো ছবি লাগানো হয়েছে এই কক্ষে।

প্রদর্শিত ছবিগুলোর মধ্যে আছে বিভিন্ন সময়ে পরিবেশিত বন্দেমাতরম গানের রেকর্ডের প্রচ্ছদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুরে প্রভাবিত এবং তাঁর প্রভাব-বহির্ভূত সুরে বন্দেমাতরম প্রভৃতি।


২০০৪ থেকে ২০০৯— এই সময়কালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থপতি-বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ মেনে উনিশ শতকে তৈরি ভবনটির আমূল সংস্কার করা হয়। সংরক্ষণের আগের মূল দেওয়ালের একাংশ প্রদর্শিত হয়েছে। কাচের শো কেসে আছে পুরনো বাড়ির ১১ ইঞ্চি বাই ৬.৪ ইঞ্চি মাপের ইটের নমুনা।


সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায় তৈরি দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের ভাস্কর্য। বেদিতে ব্রোঞ্জের পাতে খোদাই বন্দেমাতরম-এর বেশ কটি ছত্র।

ভবনের দোতলার ওঠার সিঁড়ির ধারে বঙ্কিমচন্দ্রের বাবা যাদবচন্দ্র ও দাদা সঞ্জীবচন্দ্রর বড় বাঁধানো ছবি। ওপরে উঁচুতে কড়িবর্গার ছাদ। ইংরেজি ‘এল’ আকারের বারান্দা।

বারান্দার পাশে ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্র কক্ষ, বাইরে দেওয়ালে ব্যারিস্টার প্রমথনাথ মিত্রর, বঙ্কিমচন্দ্রের একাধিক এবং দুই ভাই পূর্ণচন্দ্র ও শ্যামাচরণের বড় বাঁধানো ছবি।

দোতলায় বঙ্কিমচন্দ্রের শয়নকক্ষে বড় খাট, আলমারি, দেওয়াল ঘড়ি প্রভৃতি, লেখার ঘর, আছে তাঁর লেখার ঘর, সাহিত্য-কৃতি কক্ষ। শেষ কক্ষটির দেওয়ালে প্রায় ২০ বর্গফুট মাপের পাঁচটি তৈলচিত্র, একটি বড় জলরঙের কাজ, কাচের শো কেসে ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র কুন্দনন্দিনীর এবং ‘কৃষ্ণকান্তর উইল’ উপন্যাসের জমিদার কৃষ্ণকান্তর মূর্তি। কুন্দনন্দিনীর প্লাস্টার অফ প্যারিস এবং কৃষ্ণকান্তর ব্রোঞ্জের মূর্তির ভাস্কর যথাক্রমে বিপীন গোস্বামী এবং নিরঞ্জন প্রধান।

সংলগ্ন অন্য ভবনের একতলায় প্রদর্শশালা। এখানে ঢোকার জন্য প্রবেশমূল্য মাথাপিছু ১০ টাকা। প্রতিটি কক্ষের মতো এখানেও ছবি তোলা নিষিদ্ধ। বাইরে জুতো খুলে ঢুকতে হয়। কেবল এই কক্ষে দেওয়ালে ৮০টি বাঁধানো ছবি। কাচের শো কেসে আছে যদুভট্টের কাছে বঙ্কিমচন্দ্রের শেখা গানের মূল স্বরলিপি, ‘বঙ্গদর্শন’-এর হিসাব রাখার নথি, কাঠের ক্যাশবাক্স, সেজবাতি। বঙ্কিম-ভবনের কিউরেটর গৌতম সরকারের সঙ্গে সাংবাদিক অশোক সেনগুপ্ত।

সংলগ্ন বঙ্কিমচন্দ্রের লেখার ছোট্ট ঘরে গোটা কুড়ি বাঁধানো ছবি। এগুলোর মধ্যে আছে প্রমোদ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের আঁকা বঙ্কিমচন্দ্রের পোর্ট্রেট, রজনীকান্ত গুপ্তের লেখা ‘সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস’-এর প্রথম ভল্যুমের প্রুফ (এটি সংশোধন করেছিলেন সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)। আছে বন্দেমাতরম মুদ্রণের যন্ত্র। সঞ্জীবচন্দ্র কিনেছিলেন বলে প্রথমে বলা হত সঞ্জীবনী যন্ত্র। এখানেই ১৮৭৪-এর অক্টোবর মাসে ছাপা হয় বন্দেমাতরম পত্রিকাটি। ওই ঘরে আছে বঙ্কিমচন্দ্রের চেয়ার, টেবিল। গৌতম সরকার জানালেন এদুটি নকল। আসল চেয়ারটি আছে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে, আসল টেবিলটি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ন্যাশনাল লিডার্স পোর্ট্রেট গ্যালারিতে।

“যে জাতির পূর্ব্বমাহাত্ম্যের ঐতিহাসিক স্মৃতি থাকে, তাহারা মাহাত্ম্যরক্ষার চেষ্টা পায়, হারাইলে পুনঃপ্রাপ্তির চেষ্টা করে। ক্রেসী ও আজিন্কুরের স্মৃতির ফল ব্লেন্হিম্ ও ওয়াটর্লু—ইতালি অধঃপতিত হইয়াও পুনরুত্থিত হইয়াছে। বাঙ্গালী আজকাল বড় হইতে চায়,—হায়! বাঙ্গালীর ঐতিহাসিক স্মৃতি কই?” লিখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ভারতের ৮০-তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে তাঁর সেই পূণ্যভূমিতে।

যাদবেশ্বর শিব মন্দির
বঙ্কিমচন্দ্রের বড়দাদা শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত বাবা যাদবচন্দ্রের নামে যাদবেশ্বর শিব মন্দির। ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে শিয়ালদহ থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত ১১১ মাইল রেলপথ তৈরি হয়। ওই বছর রথযাত্রার দিন এই লাইনে প্রথম ট্রায়াল রান হয়েছিল। সেইদিন শ্যামাচরণ চট্টোপাধ্যায় বাবার নামে এই শিব মন্দির ও মা দুর্গাসুন্দরী দেবীর নামে রথ চালু করেন।

“পৃথিবীর সব দেশের মানুষেরই কৌতুহল থাকে বিখ্যাত মনীষীদের ঘরের কথা জানার। মনীষীর অন্দরমহলের খবর জানতে পাঠকের উৎসাহ আগ্রহের অভাব নেই। মনস্বী ব্যক্তিদের স্ত্রীর কথা, পুত্র-কন্যাদের কথা, তাঁর প্রিয়জনদের কথা, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনাচরণের কথা মানুষ জানতে চায়। আর
মানুষ জানতে চায় সেই মনস্বী পুরুষ যে বাড়িতে বাস করতেন সেই বাড়ির যাবতীয় কথা ও কাহিনী”— অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য।


Recent Comments