সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের (Middle East) পরিস্থিতি আক্ষরিক অর্থেই বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। ইসরাইলের (Israel) হামলায় ইরানের (Iran) সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানির (Ali Larijani) মৃত্যুতে সেই আগুনে নতুন করে ঘৃতাহুতি পড়েছে। তবে এই বড়সড় ধাক্কার পরও দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়বে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি (Abbas Araghchi)। শুধু তাই নয়, লারিজানিকে হত্যার কড়া জবাব দিতে ইতিমধ্যেই চরম প্রতিশোধের অঙ্গীকার করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (Islamic Revolutionary Guard Corps) বা আইআরজিসি (IRGC)।
আন্তর্জাতিক সম্প্রচার মাধ্যম আল জাজিরাকে (Al Jazeera) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাগচি জানিয়েছেন, “আমি সত্যিই বুঝতে পারি না কেন আমেরিকা (America) এবং ইসরাইল এখনও এই সাধারণ বিষয়টা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছে! ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুদৃঢ় রাজনৈতিক পরিকাঠামো রয়েছে। এখানকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলি এতটাই শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতে গোটা ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে না।” গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন আমেরিকা এবং ইসরাইল যৌথভাবে যুদ্ধ শুরু করে, তার আগে আমেরিকার সঙ্গে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এই আরাগচি।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ হামলায় ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি (Ayatollah Ali Khamenei) এবং আরও বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যু হয়। খামেনির মতো এমন একজন অবিসংবাদিত স্তম্ভের মৃত্যুর পর, লারিজানিই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অন্যতম প্রধান কাণ্ডারী হিসেবে উঠে এসেছিলেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ব্যক্তিবিশেষের প্রভাব অনস্বীকার্য হলেও, দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা কারোর ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি উদাহরণ টেনে বলেন, “আমাদের কাছে সুপ্রিম লিডারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর কেউ ছিলেন না। তিনি যখন শহিদ হলেন, তখনও আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র তার কাজ চালিয়ে গেছে এবং অবিলম্বে তাঁর বিকল্প খুঁজে নেওয়া হয়েছে। ফলে অন্য কেউ যদি শহিদ হন, তবে রাষ্ট্রের চলার পথে কোনো ছেদ পড়বে না।”
ইসরাইলের এই হামলায় কেবল লারিজানি নন, দুর্ভাগ্যবশত তাঁর ছেলে মুর্তজা (Mortaza) এবং তাঁর সহকারী আলিরেজা বায়াতও (Alireza Bayat) প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি হামলায় বাসিজ (Basij) আধা-সামরিক বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলেইমানি-র (Gholamreza Soleimani) মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত করা হয়েছে। পরপর এতগুলি মৃত্যুর খবরে স্বাভাবিকভাবেই দেশটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তবে সেই শোক এখন পরিণত হচ্ছে বারুদে।
আইআরজিসি-র পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে শোকজ্ঞাপনের পাশাপাশি বলা হয়েছে, “এই সম্মানিত শহিদদের রক্ত বিশ্বব্যাপী ঔদ্ধত্য এবং আন্তর্জাতিক জায়নবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় সতর্কতা ও শক্তির উৎস হয়ে উঠবে।” তারা আরও জানিয়েছে যে, শত্রুদের বিরুদ্ধে এই হত্যার চূড়ান্ত প্রতিশোধ নিতে তারা একবিন্দুও পিছপা হবে না।
কথার সঙ্গে কাজের মিল রাখতেই লারিজানির মৃত্যুর খবর সামনে আসার পরপরই ইরান তাদের পাল্টা আঘাত হানা শুরু করেছে। জানা গেছে, ইসরাইল এবং পারস্য উপসাগরের (Persian Gulf) কয়েকটি দেশের দিকে তাক করে নতুন করে ড্রোন এবং মিসাইল হামলার ঝড় বইয়ে দিয়েছে তেহরান (Tehran)। আইআরজিসি-র এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, লারিজানির শাহাদাতের প্রতিশোধ হিসেবে তারা তেল আবিব (Tel Aviv) শহরের ১০০টিরও বেশি স্থানে সফলভাবে আঘাত হেনেছে। এছাড়াও পবিত্র আল-কুদস (Al-Quds), হাইফা (Haifa) বন্দর, ইসরাইলের প্রযুক্তিগত প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত বিয়ার শেভা (Be’er Sheva) এবং নেগেভ মরুভূমি-র (Negev Desert) মতো সংবেদনশীল ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলিকেও তারা টার্গেট করেছে।


Recent Comments