back to top
Thursday, April 16, 2026
Leaderboard Ad Space (728x90) - Responsive
Homeসম্পাদকীয়মহিলা প্রার্থীদের অবস্থান ও পশ্চিমবঙ্গে আগামী বিধানসভা নির্বাচন

মহিলা প্রার্থীদের অবস্থান ও পশ্চিমবঙ্গে আগামী বিধানসভা নির্বাচন

অশোক সেনগুপ্ত

তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা-কর্ণধার নিজেই মহিলা। দলের জন্মলগ্ন থেকেই মহিলা প্রতিনিধিদের সংখ্যা যথেষ্ট। সে তুলনায় এ রাজ্যে অনেকটাই পিছিয়ে বিজেপি, বাম এবং কংগ্রেস। এবারের বিধানসভা নির্বাচনেও ছবিটা অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে।

বিভিন্ন দলের প্রার্থীর নাম-তালিকা প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। তৃণমূলের ২৯১ নামের মধ্যে মহিলা প্রার্থী ৫২! তাঁদের অনেকে তথাকথিত সেলিব্রিটি। এবার টলিউডের নতুন মুখ নেই। ভবানীপুর কেন্দ্র থেকে আগামী ভোটে প্রার্থী হতে চলেছেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের গুরুত্বপূর্ণ শ্যামপুকুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের হয়ে লড়বেন শশী পাঁজা। চৌরঙ্গিতে তৃণমূল প্রার্থী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়। বরাহনগরে সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়।

গত বছর ২৭ ফেব্রুয়ারি নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামের তৃণমূলের বর্ধিত কর্মিসভার মঞ্চ থেকে দলের নারীশক্তির প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। পাশাপাশি জানান, তৃণমূলের তরফে মহিলাদের যেভাবে এগিয়ে দেওয়া হয় লড়াইয়ে, যেভাবে তাঁদের শক্তিকে সম্মান করা হয়, তা অন্য কোনও দলে হয় না। 

তিনি দাবি করেছিলেন, ‘লোকসভায় আমাদের মেয়ে প্রার্থীদের সংখ্যা ৩৯ শতাংশ। ইলেকশনের আগে ৩৩ শতাংশ বলা হয় কমিশনের তরফে। অন্য দলগুলো দেয় না। আমরা দিই। হারা সিটে নয়, জেতা সিটে দিই। লোকসভা এবং রাজ্যসভায় তারা রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মতো লড়াই করে। সুদীপ, কল্যাণ, ডেরেকদের পাশেই লড়াই করে সাগরিকারা।’

বরাবরই দেখা গিয়েছে অন্য দলগুলো নারী প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে তৃণমূলের চেয়ে অনেকটা পিছিয়ে। এবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি-র প্রথম দফায় ঘোষিত ১৪৪ আসনের মধ্যে মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা ১১। চূড়ান্ত পূর্ণতালিকা হলেও অনেকটা পিছিয়ে থাকবে তৃণমূলের চেয়ে।

বিজেপি-র মহিলা মোর্চার দক্ষিণ কলকাতা জেলার প্রাক্তন সভাপতি ও প্রাক্তন সম্পাদক মিতালি সাহা এই পরিসংখ্যান পিছিয়ে থাকার দ্যোতক বলে মনে করেন না। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “তৃণমূলের ব্যাপ্তি শুধু রাজ্যের মধ্যে, আর তিনি তো বলেন ২৯৪ টা আসনে তিনিই প্রার্থী। সুতরাং ওই দলে মহিলাদের ভালো বক্তা হবার প্রয়োজন পড়ে না, বাজেট সম্বন্ধে জ্ঞানের প্রয়োজন নেই, পুতুল হয়ে থাকলেই চলবে, এবং দিদিমণি ফুলদানি সাজানোর হিসাবেই. মহিলা প্রার্থীদের ব্যবহার করেন। বিজেপি-তে মহিলাদের বক্তব্য রাখার ক্ষমতা, সরকার পরিচালনার (অন্তত পক্ষে বিভাগীয়) জ্ঞানের দিকটি বিবেচ্য l সুষমা স্বরাজ, উমা ভারতী, স্মৃতি ইরানী, বসুন্ধরা রাজে, নির্মলা সীতারামন, সুমিত্রা মহাজন, পুনম মহাজন – আরও অনেক বিদগ্ধ মহিলা ছিলেন বা আছেন, যাঁরা সর্ব ভারতীয় স্তরে উল্লেখ জনক ছাপ রেখে গেছেন। বিজেপি তে শুধু লিঙ্গ বেছে টিকিট দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় দলের সঙ্গে কত দিনের সম্পর্ক, যোগ্যতা দেখে।”

আরো পড়ুন:  একঝলকে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)

যদিও প্রবীন সাংবাদিক সুস্মিতা রায় এই প্রতিবেদককে জানান, “মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এই রাজ্যের প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী। তিনি মহিলাদের জন্য নানা জনপ্রিয় প্রকল্প করে নিঃসন্দেহে তাঁদের মন জয় করেছেন। এ ছাড়া, তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতাও খুবই প্রশংসনীয়। যতই এই রাজ্য প্রগতিশীলতার বড়াই করুক, আদতে মহিলাদের এখনও দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা হয়। মুখ্যমন্ত্রী মহিলাদের এই হীনমন্যতা থেকে মুক্তি দিতে চান। শুধু নিজে নয়, বহু ক্ষেত্রে মহিলাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে চান। এর জন্যই হয়ত তাঁর দলে মহিলা জন প্রতিনিধির সংখ্যা বেশি, তাঁর এই মানসিকতাকে সম্মান, শ্রদ্ধা জানাতেই হয়।”

এখন পর্যন্ত বামেদের প্রথম দফায় ঘোষিত ১৯২ জনের মধ্যে মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা ২৮। হুমায়ুন কবীরের আম জনতা উন্নয়ন পার্টি কার সঙ্গে জোট বাঁধবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। হুমায়ুন জানিয়েছেন, আশাউদ্দিন ওয়েসির নেতৃত্বাধীন এআইমিম দলের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে লড়বে তাঁর দল। দুই দলের মধ্যে আসন সমঝোতার আলোচনা বাকি রয়েছে। সেটি শেষ হলেই বাকি আসনের প্রার্থীদের নাম ঘোষণা হবে বলে জানান তিনি। তবে বুধবার তিনি ১২ জনের প্রার্থীতালিকা প্রকাশ করেছেন। তাতে বৈষ্ণবনগর কেন্দ্রের প্রার্থী হিসাবে মুসলমান বিবির নাম দেখা যাচ্ছে।

তৃণমূলে মহিলা সংখ্যাধিক্যের মূল কারণ কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবমূর্তি? কলকাতার
নাট্যকর্মী, বাচিকশিল্পী ও দূরদর্শনের অনুষ্ঠানের সংযোজিকা সুদেষ্ণা দাশগুপ্ত এই প্রতিবেদককে বলেন, “আজকের দিনে এটা সম্পূর্ণ একটা ভুল মত যে মহিলাদের মধ্যে মমতার জনপ্রিয়তা বেশি। লক্ষ্ণীশ্রী, কন্যাশ্রী অন্তত এবারের ভোটে ফল ফেলতে পারবে না বলেই আমার ধারণা। জনপ্রতিনিধি যে যার মতো দেয়, দলে মহিলার সংখ্যা বেশি থাকলে প্রতিনিধিও বেশি হয়। আমার নিজস্ব মতামত এই যে সুযোগ মতো মহিলা ট্রাম্প-কার্ড খেলানো যায় বলে অনেক সময়ে কর্মঠ পুরুষ-কর্মীর যোগ্যতা থাকা সত্বেও মহিলাদের প্রতিনিধি করা হয়।”

রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামা ১১৪ জন মহিলা প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ২৮ জন মহিলা বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৬ ও ২০১১ সালে নির্বাচিত মহিলা জনপ্রতিনিধির সংখ্যা দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৭ এবং ৩৪ জনে। ২০১৬ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ৪০ জন হলেও রাজ্যে মোট আসনের নিরিখে মহিলা প্রতিনিধিত্বের শতকরা হার ছিল মাত্র ১৩.৬!

আরো পড়ুন:  ভোটের মুখে শঙ্কা আর অনিশ্চয়তাই বুঝি সম্বল বাংলাদেশের সংখ‍্যালঘুদের

২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে শাসকদলের প্রার্থী তালিকায় মহিলা প্রতিনিধির শতকরা হার ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ। সেই ক্ষমতাসীন দল ২০২১-এর ২৭ মার্চ তাদের প্রার্থী তালিকা সামনে আনার পরে দেখা যায়, তা দু’শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৭ শতাংশ হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় বলেন, ‘‘লিঙ্গবৈষম্য হল এক ধরনের মৌলবাদী প্রথা। শুধুমাত্র রাজনৈতিক ভাবে মহিলা প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বী করেই নয়, বরং সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে সেই প্রথা আমরা দূর করতে চাই। কিন্তু এটা এক দিনে হবে না। এ জন্য সময় লাগবে।’’

গোটা দেশের অবস্থাটাও আশাব্যঞ্জক নয়। ‘ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন’-এর রিপোর্টে (১ জানুয়ারি, ২০২১)। রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহণের নিরিখে ১৮৮টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৪৮! যদিও এক সমাজতাত্ত্বিকের কথায়, ‘‘রাজনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ আর সমাজে মহিলাদের অবস্থাকে এক করে দেখাটা বোধহয় সরলীকরণ হয়ে যাবে। কারণ, তালিকায় তো পাকিস্তানও (১১৬তম স্থানে) ভারতের থেকে এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু সেখানকার সমাজে মহিলাদের পরিস্থিতি তো এ দেশের থেকে ভাল নয়।’’

রাজনীতির আঙিনায় পুরুষ প্রতিনিধিত্বের প্রাধান্য ভুলে নারীদের অংশগ্রহণে সাম্য আনতে আরও কতটা সময় লাগবে? সে উত্তরও আপাতত সময়ের গর্ভেই রয়েছে!

Author

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Demo Ad
Sponsored Links

Most Popular

Recent Comments