সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান নেওয়ার আবেদন খারিজের ঘটনায় বড় নির্দেশ কলকাতা হাই কোর্টের। দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাসিন্দা সৌমেন সেন ও তাঁর স্ত্রী সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান নিতে চেয়ে আলিপুর আদালতের অতিরিক্ত জেলা বিচারকের কাছে আবেদন করেছিলেন। তার আগে জেলা মেডিক্যাল বোর্ড থেকেও প্রয়োজনীয় শংসাপত্র সংগ্রহ করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু অভিযোগ, দম্পতির মেডিক্যাল শংসাপত্র এবং সারোগেট মায়ের নথিপত্র যাচাইয়ের পর আবেদন খারিজ করে দেওয়া হয়।
ম্যাজিস্ট্রেটের তরফে জানানো হয়েছিল, কয়েকটি শংসাপত্রের বৈধতার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি সারোগেট মায়ের মানসিক সুস্থতার শংসাপত্রেও প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। আবেদনকারী বাবার বয়স নিয়েও আপত্তি জানানো হয়। তাঁর বয়স ৫৫ বছরের বেশি হওয়ায় সারোগেসির মাধ্যমে সন্তান নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি উপযুক্ত নন বলে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।
এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন দম্পতি। বিচারপতি কৌশিক চন্দের এজলাসে মামলাটির শুনানিতে দম্পতির আইনজীবী কল্লোল বসু এবং আত্রেয়া চক্রবর্তী জানান, সারোগেসির নিয়ম মেনেই তাঁদের মক্কেলরা জেলা মেডিক্যাল বোর্ড থেকে প্রয়োজনীয় শংসাপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। এরপর আইনি অনুমতির জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করা হয়। কিন্তু বয়স ও স্বাস্থ্যের বিষয় উল্লেখ করে সেই আবেদন খারিজ করা হয়।
আইনজীবীদের দাবি, গত দু’বছর ধরে আইনি অনুমতির জন্য দম্পতিকে ঘুরতে হচ্ছে। সেই সময়ের মধ্যেই মামলার কারণে তাঁদের বেশ কিছু শংসাপত্রের বৈধতার মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে।
শুনানিতে বিচারপতি কৌশিক চন্দ স্পষ্ট করে দেন, সারোগেসি আইনে ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা সীমিত। দম্পতির বয়স বা স্বাস্থ্য যাচাই করার ক্ষমতা তাঁর নেই। ম্যাজিস্ট্রেটকে মূলত নিশ্চিত করতে হবে, সারোগেট মা স্বেচ্ছায় সারোগেসিতে সম্মতি দিয়েছেন কি না এবং কোনওভাবে তাঁকে প্রতারণা বা প্রভাবিত করা হয়েছে কি না।
এছাড়াও সারোগেট মা ভবিষ্যতে ওই সন্তানের অভিভাবকত্ব দাবি করবেন না—এই বিষয়টিও নিশ্চিত করার দায়িত্ব ম্যাজিস্ট্রেটের। অর্থাৎ, সারোগেসি সংক্রান্ত আবেদনে মূলত আইনি বিষয়গুলিই বিবেচনা করার কথা। দম্পতির বয়স বা স্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক্তিয়ার ম্যাজিস্ট্রেটের নেই বলেই পর্যবেক্ষণ হাই কোর্টের।
বিচারপতি আরও জানান, দম্পতি সন্তান জন্মের পর তার দায়িত্ব নেবেন কি না, শিশুকে পরিত্যাগ করবেন না কিনা এবং তাকে প্রতিপালনের প্রয়োজনীয় আর্থিক ও সামাজিক সামর্থ্য তাঁদের রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও নিশ্চিত করতে হবে ম্যাজিস্ট্রেটকে।
এই পর্যবেক্ষণের পর সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটকে দম্পতির আবেদন নতুন করে বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। সাত দিনের মধ্যে আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। পাশাপাশি, আইনি অনুমতির জন্য দম্পতি যে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করেছেন, সেই বিষয়টিও বিবেচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের সারোগেসি (রেগুলেশন) আইনে বাণিজ্যিক সারোগেসি নিষিদ্ধ। নির্দিষ্ট শারীরিক কারণে সন্তানধারণে অক্ষম দম্পতি নির্দিষ্ট আইনি ও চিকিৎসাগত শর্ত পূরণ করে সারোগেসির সাহায্য নিতে পারেন। নিয়ম মেনে নির্বাচিত সারোগেট মা গর্ভে সন্তান ধারণ করলেও জন্মের পর শিশুটির উপর তাঁর কোনও আইনগত অভিভাবকত্ব থাকে না। নির্ধারিত পদ্ধতি মেনেই সারোগেসির জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নিতে হয়।


Recent Comments