বিধানসভা আজ কংগ্রেস-শূন্য: কোথা থেকে শুরু হলো এই উলটপুরাণ?
শূন্য। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর এই একটি মাত্র শব্দই ভারতের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেয়। যে দল একসময় জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিল, যারা ১৯৪৭ সালের পর এই রাজ্যের ভাগ্যবিধাতা ছিল, তাদের জন্য বিধানসভার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় । স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কোনো প্রতিনিধি রইল না । এটি কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক দুর্ঘটনা ছিল না, বা কোনো একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনের মেরুকরণের ফলও ছিল না । এটি ছিল গত সাত দশক ধরে চলা এক ধারাবাহিক, যন্ত্রণাদায়ক এবং অনিবার্য রাজনৈতিক আত্মহত্যার চূড়ান্ত পরিণতি ।
কীভাবে একটি দল, যারা একসময় অবিসংবাদিত ক্ষমতার অধিকারী ছিল, তারা ধীরে ধীরে একটি প্রান্তিক, দর্শকদলে পরিণত হলো? কীভাবে দিল্লির ‘হাইকমান্ড’ সংস্কৃতির অহংকার এবং স্থানীয় নেতৃত্বের মেরুদণ্ডহীনতা একটি শক্তিশালী সংগঠনকে তিলে তিলে ধ্বংস করল? এই উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই যুগে, যখন কংগ্রেসের ছত্রছায়ায় বাংলার আধুনিকীকরণ শুরু হয়েছিল ।
বিধান রায়ের ক্যারিশমার আড়ালে ঢাকা পড়েছিল যে কঙ্কালসার সংগঠন
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্র ছিল ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত। র্যাডক্লিফ লাইনের খামখেয়ালিপনায় অবিভক্ত বাংলার দুই-তৃতীয়াংশ উর্বর কৃষিজমি রাজ্যের হাতছাড়া হয় । অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রতিদিন স্রোতের মতো ছুটে আসছিল ছিন্নমূল, সর্বস্বান্ত উদ্বাস্তুদের দল । এই অভূতপূর্ব অস্তিত্বের সংকটের মধ্যেও, ১৯৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচন থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস এই রাজ্যে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রেখেছিল ।
এই স্থিতিশীলতার নেপথ্যে ছিলেন একজনই মানুষ—রাজ্যের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী, ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় । তাঁর শাসনকাল ছিল দ্রুত শিল্পায়ন, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ব্যবসা বাণিজ্য এবং আগ্রাসী নগর পরিকল্পনার এক অদ্ভুত মিশেল । দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট, কল্যাণীর মতো ইঞ্জিনিয়ারিং টাউনশিপ, কিংবা সল্টলেকের (বিধাননগর) মতো স্যাটেলাইট শহর—এই সব মেগা-প্রজেক্ট কংগ্রেসকে আধুনিকতা ও অর্থনৈতিক প্রগতির এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত করেছিল । একজন প্রথিতযশা চিকিৎসক হিসেবে চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল বা চিত্তরঞ্জন সেবা সদনের মতো জনস্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তুলে তিনি নিজের এবং দলের ভাবমূর্তিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন ।
কংগ্রেসের এই আধিপত্য টিকে ছিল সমাজের তিনটি স্তম্ভের নিখুঁত রসায়নের ওপর—গ্রামের শক্তিশালী জমিদার বা জোতদার, শহরের শিল্পপতি এবং শহুরে বুদ্ধিজীবী শ্রেণী । কিন্তু এই বিরাট সাম্রাজ্যের ভিত্তি ছিল অত্যন্ত নড়বড়ে। কারণ, দলের পুরো কাঠামোটি ডাঃ রায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল । ১৯৬২ সালে তাঁর মৃত্যু কেবল একটি যুগের অবসান ঘটায়নি, দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকে এক লহমায় প্রকাশ্যে এনে দিয়েছিল ।
ক্ষুধার্ত রাজপথ, পুলিশের গুলি এবং বামেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত হওয়া
বিধান রায়ের মৃত্যুর পর রাজ্য কংগ্রেসের হাল ধরেন প্রফুল্ল চন্দ্র সেন। কিন্তু ততদিনে রাজ্যের অর্থনৈতিক কাঠামোতে ফাটল ধরতে শুরু করেছে । লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর চাপে কলকাতা ও তার আশেপাশের গ্রামগুলোর জনতাত্ত্বিক ও কৃষি-অর্থনীতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করে । কংগ্রেসের জনসমর্থনে প্রথম বড়সড় ধস নামে ১৯৫৯ এবং ১৯৬৬ সালের মর্মান্তিক খাদ্য আন্দোলনের সময় ।
জনবণ্টন ব্যবস্থার (PDS) চরম ব্যর্থতা এবং কংগ্রেস-ঘনিষ্ঠ জোতদারদের বেপরোয়া মজুতদারির কারণে রাজ্যে প্রায় দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয় । ১৯৫৫ সালের ডিসেম্বরে যে চালের দাম ছিল টন প্রতি ৩৮২ টাকা, ১৯৫৬ সালের ডিসেম্বরে তা লাফিয়ে ৫৩২ টাকায় পৌঁছায় । ক্ষুধার্ত, দিশেহারা কৃষকরা দলে দলে কলকাতার রাস্তায় নেমে আসে। শুরু হয় স্বতঃস্ফূর্ত এবং রক্তক্ষয়ী খাদ্য দাঙ্গা ।
অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি (CPI) এবং ১৯৬৪ সালের পর সিপিআই(এম) এই জনরোষকে অত্যন্ত সুনিপুণভাবে কাজে লাগায় । প্রাইস ইনক্রিজ অ্যান্ড ফ্যামিন রেসিস্ট্যান্স কমিটি (PIFRC)-এর মতো মঞ্চ তৈরি করে তারা ক্ষুধার্ত কৃষক এবং শ্রমিকদের ত্রাতা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে । রাষ্ট্রীয় পুলিশের নির্মম অত্যাচারে ডজন ডজন সাধারণ মানুষের মৃত্যু, সমাজের নিচুতলার মানুষদের কংগ্রেস থেকে চিরতরে বিচ্ছিন্ন করে দেয় । রাজনীতি আর দেশ গঠনের জায়গায় সীমাবদ্ধ রইল না, তা বদলে গেল শ্রেণিসংগ্রাম এবং সর্বহারার অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে ।
এই অস্থিরতার মধ্যেই ১৯৬৬ সালে অজয় মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হয় ‘বাংলা কংগ্রেস’ । ১৯৬৭ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে এই বিভাজনের সুযোগ নিয়েই সিপিআই(এম)-এর সমর্থনে রাজ্যে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয় । এর পরপরই ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলন গ্রামীণ বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে পুরোপুরি বামপন্থার দিকে ঠেলে দেয় । জোতদারদের দল হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসকে সাধারণ কৃষকরা একটি প্রতিক্রিয়াশীল, অত্যাচারী শক্তি হিসেবেই দেখতে শুরু করে ।
নকশাল দমন, পুলিশি সন্ত্রাস এবং ৭৭-এর সেই নীরব ব্যালট-বিস্ফোরণ
রাজ্যে ক্রমশ বাড়তে থাকা কমিউনিস্ট প্রভাব এবং প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা রুখতে হস্তক্ষেপ করেন খোদ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী । তাঁর ঘনিষ্ঠ সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে পাঠানো হয় এই উত্তাল প্রদেশকে শান্ত করার দায়িত্ব দিয়ে । ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় এবং কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন ছাত্র পরিষদের আগ্রাসী প্রচারকে কাজে লাগিয়ে ১৯৭২ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফেরে । প্রোগ্রেসিভ ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (PDA) ২৯৪টির মধ্যে ২১৬টি আসন দখল করে ।
কিন্তু এই জয় ছিল এক অভিশপ্ত জয়। নকশালদের দমন করতে এবং সিপিআই(এম)-এর সংগঠন ভাঙতে রাষ্ট্রযন্ত্র যে অকথ্য পুলিশি সন্ত্রাসের আশ্রয় নিয়েছিল, তা রাজ্যের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হয়ে আছে । বামপন্থী ঐতিহাসিকরা এই সময়কালকে “আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস” বলে আখ্যা দেন, যেখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলোর কণ্ঠরোধ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা ।
এর ওপর ১৯৭৫ সালের জাতীয় জরুরি অবস্থা কংগ্রেসের কফিনে আরও একটি পেরেক পুঁতে দেয় । ১৯৭৭ সালে যখন গণতন্ত্র আবার ফিরে আসে, তখন মানুষ ব্যালট বাক্সে তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটায় । বামফ্রন্ট ২৩১টি আসন নিয়ে এক ঐতিহাসিক জয় লাভ করে, আর কংগ্রেস নেমে আসে মাত্র ২০টি আসনে (২৩.০২% ভোট) । এই পরাজয় কেবল একটি নির্বাচন হারানো ছিল না, এটি ছিল ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট রাজত্বের সূচনা এবং কংগ্রেসের চিরস্থায়ী নির্বাসনের শুরু ।
অপারেশন বর্গা’ আর সিটু: গ্রাম-শহর থেকে কংগ্রেসকে সমূলে উপড়ে ফেলার বাম-নকশা
১৯৭৭ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত কংগ্রেস কেন আর ঘুরে দাঁড়াতে পারল না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বামফ্রন্টের দুটি অত্যন্ত সুকৌশলী নীতিগত পদক্ষেপে। প্রথমত, ‘অপারেশন বর্গা’। সত্তরের দশকের শেষে শুরু হওয়া এই ভূমি সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে বর্গাদারদের (ভাগচাষী) আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয় এবং জমিদারদের উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয় ।
এই একটি মাত্র চালে বামফ্রন্ট গ্রামীণ জোতদার শ্রেণিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। এই জোতদাররাই ছিল গ্রামে কংগ্রেসের প্রধান ভোট-ব্যাঙ্ক । এরপর পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থাকে হাতিয়ার করে গ্রামের প্রতিটি স্তরে সিপিআই(এম) তাদের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী তৈরি করে । কংগ্রেসের কোনো তৃণমূল স্তরের ক্যাডার-ভিত্তিক সংগঠন না থাকায়, তারা কার্যত গ্রামের রাজনীতি থেকে মুছে যায় ।
একইভাবে, শিল্পাঞ্চলগুলোতেও কংগ্রেস প্রভাবিত আইএনটিইউসি (INTUC)-কে খাদের কিনারে ঠেলে দেয় বামেদের শ্রমিক সংগঠন সিটু (CITU) । ১৯৭৪ সালের ঐতিহাসিক রেল ধর্মঘটে কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠন দূরত্ব বজায় রাখলেও, সিটু সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে শ্রমিকদের মন জয় করে নেয় । বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর সরকারি আনুকূল্যে সিটু সর্বেসর্বা হয়ে ওঠে, আর আইএনটিইউসি ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে ।
দিল্লির ‘হাইকমান্ড’ সংস্কৃতির অহংকার এবং এক জেদি যুবনেত্রীর মোহভঙ্গ
রাজ্য কংগ্রেসের এই পতনের জন্য বামেদের চেয়েও বেশি দায়ী ছিল দিল্লির ‘হাইকমান্ড’। ইন্দিরা গান্ধী বা রাজীব গান্ধী কখনই চাননি রাজ্যে এমন কোনো শক্তিশালী নেতার উত্থান হোক, যে দিল্লির চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে । ফলস্বরূপ, রাজ্য নেতারা নিজেদের মধ্যে দলাদলি আর ক্ষমতা দখলের নোংরা খেলায় মত্ত থাকতেন ।
নব্বইয়ের দশকে কেন্দ্রে যখন জোট রাজনীতির যুগ শুরু হলো, তখন ইউপিএ-১ (UPA-I) এর মতো সরকার বাঁচাতে দিল্লিতে সিপিআই(এম)-এর সমর্থন কংগ্রেসের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াল । ক্ষমতার এই সমীকরণে রাজ্য কংগ্রেসকে বারবার বামেদের প্রতি নরম মনোভাব দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হতো । এই রাজনৈতিক আপস বাংলার অ্যান্টি-লেফট বা বাম-বিরোধী ভোটারদের চরম হতাশ করেছিল। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, কংগ্রেস আসলে বামেদের উৎখাত করতে ইচ্ছুক নয় ।
এই দমবন্ধ করা পরিবেশেই জন্ম হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের । যুব কংগ্রেসের এই লড়াকু নেত্রী খুব স্পষ্টভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে বিবৃতি দিয়ে বাম ক্যাডার-বাহিনীর মোকাবিলা করা সম্ভব নয় । ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানে ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মীর পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর পরও যখন দিল্লির নেতৃত্ব নীরব রইল, তখন মমতা নিশ্চিত হন যে কংগ্রেসের মাধ্যমে বাম-পতন অসম্ভব । ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তিনি সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (AITC) গঠন করেন ।
তৃণমূলের জন্মই ছিল কংগ্রেসের মৃত্যুঘণ্টা। মমতা নিজেকে আসল কংগ্রেস হিসেবে তুলে ধরলেন, আর বাম-বিরোধী ভোটাররা এক লহমায় কংগ্রেস ছেড়ে তাঁর ছাতার তলায় চলে এলো । সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনে কংগ্রেস যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, মমতা তখন ‘মা মাটি মানুষ’ স্লোগান তুলে সাধারণ কৃষকের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন । ২০১১ সালের নির্বাচনে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের দুর্গের যখন পতন হলো, তখন কংগ্রেস কেবল তৃণমূলের লেজুড় হিসেবে ৪২টি আসন জিতেছিল। স্বাধীনভাবে ভোটে জেতার কোনো ক্ষমতাই তাদের আর অবশিষ্ট ছিল না ।
ভোটব্যাঙ্কের নতুন সমীকরণ: গনি খান ও অধীরের সাজানো দুর্গে ঘাসফুলের থাবা
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী অংকে প্রায় ২৭-৩০ শতাংশ মুসলিম ভোটার সবসময় একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে । দেশভাগের পর এরা কংগ্রেসকে সমর্থন করলেও, পরবর্তীতে বামেদের নিরাপত্তায় তারা সিপিআই(এম)-এর দিকে ঝুঁকেছিল । কিন্তু ২০০৬ সালের সাচার কমিটির রিপোর্ট এই মিথ ভেঙে দেয়। রিপোর্টটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বাম শাসনে রাজ্যের মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষাগত অবস্থা অত্যন্ত করুণ ।
এই সুযোগটি অসাধারণ দক্ষতায় কাজে লাগান মমতা। তিনি ওবিসি সংরক্ষণ, ইমাম ভাতা এবং নানাবিধ উন্নয়নমূলক প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ককে পুরোপুরি নিজের দিকে টেনে নেন । কংগ্রেস, যাদের কোনো সুনির্দিষ্ট উন্নয়নমূলক লক্ষ্য ছিল না, তারা এই বিশাল ভোটব্যাঙ্ক থেকে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ।
এমনকি মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের মতো একসময়ের অজেয় কংগ্রেস দুর্গগুলোও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে । মালদহে গনি খান চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং ভাইঝি মৌসম নূরের তৃণমূলে যোগদান কংগ্রেসের সংগঠনকে ধ্বংস করে দেয় । অন্যদিকে মুর্শিদাবাদে অধীর রঞ্জন চৌধুরীর দুর্গে তৃণমূল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে প্রশাসনিক ক্ষমতা, অর্থ এবং ‘কন্যাশ্রী’ বা ‘স্বাস্থ্যসাথী’-র মতো প্রকল্পের মাধ্যমে থাবা বসায় । গঙ্গার ভাঙনের মতো অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে সাধারণ মানুষ যখন কংগ্রেসের অক্ষমতা দেখল, তখন তারা শাসক দলের দিকেই মুখ ঘোরাতে বাধ্য হলো ।
আব্বাস সিদ্দিকির হাত ধরা এবং মেরুকরণের সাঁড়াশি চাপে চিঁড়েচ্যাপ্টা কংগ্রেস
কংগ্রেসের চূড়ান্ত কফিনে শেষ পেরেকটি পোঁতে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) অভাবনীয় উত্থান । ২০১৪ সালের পর থেকে বিজেপি রাজ্যের তৃণমূল-বিরোধী প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা, সিন্ডিকেট রাজের ক্ষোভ এবং হিন্দুত্ববাদের আখ্যানকে কাজে লাগিয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে আসে । ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ১৮টি আসন এবং ৪০.৬৪% ভোট পেয়ে প্রমাণ করে দেয় যে, রাজ্যে লড়াই এখন শুধুমাত্র তৃণমূল আর বিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ ।
অস্তিত্ব সংকটে ভুগে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়। তারা তাদের দীর্ঘদিনের চিরশত্রু সিপিআই(এম) এবং ফুরফুরা শরিফের আব্বাস সিদ্দিকির দল ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (ISF) সঙ্গে হাত মিলিয়ে ‘সংযুক্ত মোর্চা’ গঠন করে । একজন কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতার সঙ্গে এই জোট কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে ধুলিস্যাৎ করে দেয়, যার ফলে প্রগতিশীল হিন্দু ভোটাররা চরম ক্ষুব্ধ হন । বামেদের “বিজেএমূল” তত্ত্ব—অর্থাৎ তৃণমূল এবং বিজেপি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ—সাধারণ ভোটারদের কাছে সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং হাস্যকর মনে হয়েছিল ।
এই নির্বাচনে ‘ওয়েস্টেড ভোট’ বা ভোট নষ্ট হওয়ার মনস্তত্ত্ব মারাত্মক আকার ধারণ করে । মেরুকরণের এই তীব্র আবহে অ্যান্টি-টিএমসি হিন্দু ভোটাররা মনে করেছিলেন যে একমাত্র বিজেপিই মমতাকে হারাতে পারে, তাই তারা বিজেপিতে ভোট দেন । অন্যদিকে, ধর্মনিরপেক্ষ ও সংখ্যালঘু ভোটাররা বিজেপির উত্থান রুখতে একজোট হয়ে তৃণমূলকে ভোট দেন । এই দুই প্রবল মেরুর মাঝে কংগ্রেসের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ মুছে যায় ।
ইতিহাসের পাতায় নির্বাসন: ঘুরে দাঁড়ানোর কি আর কোনো রাস্তা খোলা আছে?
আজকের পশ্চিমবঙ্গে জাতীয় কংগ্রেস কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং ইতিহাসের এক করুণ অবশিষ্টাংশ মাত্র। দিল্লির নেতাদের অহংকার, আদর্শগত দেউলিয়াপনা, এবং সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে তৃণমূল স্তরে নতুন নেতৃত্ব তুলে আনতে না পারার মাশুল তাদের শূন্য দিয়ে চোকাচ্ছে হচ্ছে । মালদহ ও মুর্শিদাবাদের শেষ দুর্গগুলোর পতন প্রমাণ করেছে যে, অতীত গৌরবের স্মৃতিচারণা করে বর্তমানের ভোট বৈতরণী পার হওয়া যায় না । যদি না কোনো অভাবনীয়, আমূল সাংগঠনিক বিপ্লব ঘটে, তবে একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ এই দলটি বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে চিরকালের জন্য কেবল একটি ধূসর উপাখ্যান হয়েই রয়ে যাবে ।
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনৈতিক বিবর্তনের সময়সূচী
| সময়কাল বা বছর | রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বা ঘটনা | কংগ্রেসের প্রধান নেতৃত্ব | নির্বাচনী ফলাফল বা প্রভাব | পতনের মূল কারণ | বামপন্থী বা অন্যান্য দলের ভূমিকা |
|---|---|---|---|---|---|
| ১৯৫২ - ১৯৬২ | দেশভাগ পরবর্তী স্থিতিশীলতা ও আধুনিকীকরণ | ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় | বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখা | পুরো কাঠামোটি ডাঃ রায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ওপর অধিক নির্ভরশীল ছিল | বামপন্থীরা তখনও সংগঠিত হওয়ার প্রাথমিক স্তরে ছিল |
| ১৯৬২ - ১৯৬৭ | খাদ্য আন্দোলন ও কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ বিভাজন | প্রফুল্ল চন্দ্র সেন ও অজয় মুখোপাধ্যায় | ১৯৬৭ সালে ক্ষমতা হারানো ও রাজ্যে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন | খাদ্য সংকট, জনবণ্টন ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং দল ভেঙে 'বাংলা কংগ্রেস' গঠন | সিপিআই ও সিপিআই(এম) খাদ্য আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে জনভিত্তি তৈরি করে |
| ১৯৭১ - ১৯৭৭ | নকশাল দমন আন্দোলন ও জরুরি অবস্থা জারি | সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ও ইন্দিরা গান্ধী | ১৯৭২ সালে ২১৬টি আসনে বিশাল জয়, কিন্তু ১৯৭৭ সালে তা মাত্র ২০ আসনে নেমে আসা | পুলিশি সন্ত্রাস, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং জরুরি অবস্থার প্রতি ব্যাপক জনরোষ | বামফ্রন্ট ২৩১টি আসন নিয়ে ঐতিহাসিক জয় লাভ করে ৩৪ বছরের শাসনের সূচনা করে |
| ১৯৭৭ - ১৯৯৮ | বামফ্রন্টের আধিপত্য ও কংগ্রেসের সাংগঠনিক অবক্ষয় | দিল্লির 'হাইকমান্ড' ও স্থানীয় নেতৃত্বের দলাদলি | রাজ্যে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়া | অপারেশন বর্গা ও পঞ্চায়েতি রাজের মাধ্যমে কংগ্রেসের গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্ক ধ্বংস হওয়া | সিটু (CITU) গঠনের মাধ্যমে শ্রমিক সংগঠনে বামপন্থীদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার |
| ১৯৯৮ - ২০১১ | তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম ও বামফ্রন্ট শাসনের পতন | মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে) ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব | ২০১১ সালে তৃণমূলের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে মাত্র ৪২টি আসন লাভ | তৃণমূল কংগ্রেস গঠন এবং প্রধান বাম-বিরোধী ভোটারদের মমতার দিকে ঝুঁকে পড়া | ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটে তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে |
| ২০১৪ - ২০২১ | বিজেপির উত্থান ও কংগ্রেসের অস্তিত্ব সংকট | অধীর রঞ্জন চৌধুরী ও গনি খান চৌধুরী পরিবার | ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় প্রথমবারের মতো শূন্য আসন লাভ | আইএসএফ-এর সাথে জোট, তীব্র মেরুকরণের রাজনীতি এবং ঐতিহ্যগত ভোটব্যাঙ্ক হারানো | সিপিআই(এম)-এর সাথে 'সংযুক্ত মোর্চা' গঠন যা সাধারণ ভোটাররা প্রত্যাখ্যান করে |

Recent Comments