ক্যাম্পাসের ঝকঝকে কাচের দেওয়াল। সবুজ লনে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তোলা শিক্ষার্থীরা। বিলবোর্ডে বড় বড় হরফে লেখা — “১০০% প্লেসমেন্ট গ্যারান্টি”, “ভারতের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়”, “আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা।” প্রতিটি শহরের মোড়ে মোড়ে, পত্রিকার প্রথম পাতায়, ইউটিউবের (YouTube) বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে — ভারতের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির এই চিত্র এখন পরিচিত দৃশ্য।
কিন্তু এই চকচকে বিজ্ঞাপনের পর্দার আড়ালে কী আছে?
এই বিস্তারিত অনুসন্ধানী রিপোর্টে (investigative report) সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। আর সেই উত্তর যতটা অস্বস্তিকর, ততটাই চমকপ্রদ। একটি গোটা প্রজন্মের স্বপ্ন, মধ্যবিত্ত পরিবারের জমানো টাকা, এবং ভারতের ডেমোগ্রাফিক (demographic) ডিভিডেন্ডের ভবিষ্যৎ — সবকিছু এসে মিলেছে এই একটি প্রশ্নে: ভারতের বেসরকারি উচ্চশিক্ষা কি সত্যিই শিক্ষার কাজ করছে, নাকি শুধু মেট্রিক্স (metrics) ও মুনাফার খেলা চলছে?
রোবোডগ (Robodog) কাণ্ড: একটি রূপকথার ভাঁজে লুকানো সত্য
২০২৬ সালের শুরুতে ভারতের প্রযুক্তি দুনিয়ায় একটি ঘটনা ঝড় তুলেছিল। দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রযুক্তি মঞ্চগুলির একটি — ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট (India AI Impact Summit) ২০২৬-এ গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটি (Galgotias University) একটি জমকালো প্যাভিলিয়ন (pavilion) সাজিয়েছিল। সেই প্যাভিলিয়নের কেন্দ্রে ছিল একটি চার পায়ের রোবট — যাকে বলা হচ্ছিল “কোয়াড্রুপেড রোবোডগ” (quadruped robodog)। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা গর্বের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা, সংবাদমাধ্যম এবং দর্শকদের সামনে দাবি করেন — এটি তাদের ছাত্র ও শিক্ষকদের হাতে তৈরি, সম্পূর্ণ দেশীয় উদ্ভাবন।
কিন্তু মঞ্চের আলো নেভার আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় (social media) ঝড় উঠল।
প্রযুক্তিবিদ, রোবোটিক্স (robotics) বিশেষজ্ঞ এবং উৎসাহী নেটিজেনরা (netizens) মুহূর্তের মধ্যে চিহ্নিত করলেন — এই “দেশীয় উদ্ভাবন” আসলে চিনা (Chinese) রোবোটিক্স কোম্পানি ইউনিট্রি (Unitree)-র একটি বাজারে কেনা পণ্য। কেউ আর থামেনি। তদন্ত গভীর হতেই বেরিয়ে এল — পাশের আরেকটি প্রদর্শনীও “ইন্ডিজেনাস ইনোভেশন” (indigenous innovation) বলে দাবি করা “সকার ড্রোন অ্যারেনা” (soccer drone arena) আসলে দক্ষিণ কোরিয়ার (South Korea) একটি বাণিজ্যিক পণ্য — নাম ‘স্ট্রাইকার ভি৩ এআরএফ’ (Stryker V3 ARF)।
বিতর্ক মুহূর্তের মধ্যে জাতীয় বিব্রতের কারণ হয়ে উঠল। সামিটের আয়োজকরা বাধ্য হয়ে গালগোটিয়াস প্যাভিলিয়নের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাঙ্গণ ছেড়ে চলে যেতে বললেন। কেন্দ্রীয় সরকার সমস্ত প্রদর্শকদের আনুষ্ঠানিক সতর্কবার্তা পাঠাল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দাম্ভিক ক্ষমাপ্রার্থনা এল বটে, কিন্তু সেখানেও দায় চাপানো হল এক “অজ্ঞ” শিক্ষকের উপর — প্রফেসর নেহা সিং (Neha Singh)-এর নামে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করল, তিনি “ক্যামেরার সামনে পড়ার উৎসাহে” ভুল তথ্য দিয়েছেন। এরপর অবশ্য কৌশল পালটে বলা হল — রোবটগুলি আসলে ছাত্রদের পড়ানোর যন্ত্র ছিল, আর গোটা বিতর্কটাই নাকি তাদের বিরুদ্ধে “প্রপাগান্ডা ক্যাম্পেন” (propaganda campaign)।
এই একটি ঘটনা ভারতের বেসরকারি উচ্চশিক্ষার সংকটের এত নিখুঁত প্রতীক হয়ে উঠেছে যে অনুসন্ধানকারীরা বলছেন — রোবোডগ কাণ্ড আসলে এক বিশাল সত্যের ক্ষুদ্রতম দৃশ্যমান অংশ মাত্র।
বিস্তারের বাগানে বিষের বীজ
ভারতের উচ্চশিক্ষা এখন এক অভূতপূর্ব বিস্তারের মুখে। ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিও (Gross Enrolment Ratio বা GER) ৫০%-এ নিয়ে যাওয়ার জাতীয় লক্ষ্য এবং ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষাযোগ্য জনসংখ্যা ১৬৫ কোটিতে পৌঁছানোর আশঙ্কায় দেশের সামনে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। সেই চাহিদা মেটাতে ক্রমশ বেড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা।
আজকের দিনে ভারতে প্রায় ৭৫% উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বেসরকারি মালিকানায়। এবং দেশের মোট শিক্ষার্থীর ৬৬%-ই এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে পড়েন। প্রতি বছর দেশ থেকে বেরিয়ে আসেন প্রায় ১৫ লক্ষ ইঞ্জিনিয়ারিং (engineering) গ্র্যাজুয়েট — সংখ্যার বিচারে যা বিশ্বে তুলনাহীন।
কিন্তু সংখ্যার এই বিশালত্ব কি মানের নিশ্চয়তা দেয়?
সেখানেই আসল সমস্যা।
পেটেন্টের (Patent) মায়াজাল: কাগজে উদ্ভাবন, বাস্তবে শূন্য
যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সংস্কৃতির মাপকাঠি হিসেবে পেটেন্ট (patent)-কে ধরা হয়। কিন্তু ভারতের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পেটেন্ট ফাইলিং (patent filing)-এর পরিসংখ্যান দেখলে মাথা ঘুরে যায় — তবে সেটা উৎসাহের কারণে নয়, উদ্বেগের কারণে।
ভারতীয় পেটেন্ট অফিসের (Indian Patent Office বা IPO) ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষের তথ্য বলছে, পেটেন্ট আবেদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯২,১৬৮টি এবং গ্রান্টেড (granted) পেটেন্টের সংখ্যা ২০১% বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যার উৎসবের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি ভয়াবহ সত্য।
আইপিও (IPO)-র একটি রিপোর্টেই স্বীকার করা হয়েছে — বিশ্ববিদ্যালয়গুলির দাখিল করা ৬০%-এরও বেশি পেটেন্ট কোনোদিন বাণিজ্যিক রূপ পায়নি। আরও চমকে দেওয়ার মতো তথ্য হল, বিশেষজ্ঞরা বলছেন একাডেমিক (academic) সেক্টরের প্রায় ৯৬% পেটেন্টই বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর নয়। ফর্ম-২৭ (Form-27) নামের একটি বাধ্যতামূলক রিটার্ন (return) — যেটি দিয়ে প্রমাণ করতে হয় পেটেন্ট ব্যবহার হচ্ছে — সেই তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বাণিজ্যিক পেটেন্টের সংখ্যা পাঁচ বছরে ১৬,০০০ থেকে নেমে মাত্র ৫৬০-তে ঠেকেছে।
এখানেই কিছু তুলনামূলক তথ্য চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট:
আইআইটি মাদ্রাজ (IIT Madras) — ভারতের সেরা গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৭৫ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ বছরে এই প্রতিষ্ঠানের মোট পেটেন্ট ফাইলিং প্রায় ২,৫৫০টি।
গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটি — ২০১৭ থেকে ২০২৪, মাত্র সাত বছরে ফাইল করেছে ২,৪৩০টি পেটেন্ট।
চণ্ডীগড় ইউনিভার্সিটি (Chandigarh University) — মোট ফাইলিং ৫,৫১৯টি। কিন্তু গ্রান্ট পেয়েছে মাত্র ২৩৮টি।
লাভলি প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটি (Lovely Professional University বা LPU) — মাত্র ২০২৫ সালেই ১,৪১৮টি পেটেন্ট ফাইল করে দেশের সমস্ত আইআইটি (IIT) ও এনআইটি (NIT)-কে পেছনে ফেলে দিয়েছে বলে দাবি।
প্রশ্নটা এখানেই উঠছে — যে প্রতিষ্ঠান পঞ্চাশ বছরে যা করেছে, কোনো তুলনামূলক নতুন প্রতিষ্ঠান সাত বছরে সেই সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলছে কীভাবে? উত্তরটা সহজ — পেটেন্ট আর গবেষণার মাধ্যম হয়নি, হয়ে উঠেছে র্যাংকিং (ranking) বাড়ানোর অস্ত্র।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশনাল র্যাংকিং ফ্রেমওয়ার্ক (National Institutional Ranking Framework বা NIRF) এবং ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড অ্যাক্রিডিটেশন কাউন্সিল (National Assessment and Accreditation Council বা NAAC)-এ পেটেন্টের সংখ্যা সরাসরি স্কোর (score) বাড়ায়। আর সেই স্কোর বাড়লেই বাড়ে বিজ্ঞাপনের দাবি, বাড়ে ভর্তির আবেদন, বাড়ে ফি। পেটেন্ট ফাইল করাটাই এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে “ফিনিশ লাইন” (finish line) — সেটি কোনোদিন প্রোডাক্টে (product) পরিণত হবে কিনা, সেটা বিবেচনারই বাইরে।
উদ্ভাবন অর্থনীতিতে (innovation economics) এই সমস্যার একটি নাম আছে — “ভ্যালি অব ডেথ” (Valley of Death)। গবেষণা যেখানে ধারণা থেকে বাজারে পৌঁছাতে পারে না, সেখানেই মৃত্যু হয়। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সাধারণত টেকনোলজি রেডিনেস লেভেল (Technology Readiness Level বা TRL) ৭ বা ৮-এ পৌঁছানো গবেষণায় আগ্রহ দেখায়। অথচ ভারতের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা আটকে থাকে TRL ৩ বা ৪-এ, অর্থাৎ শুধু প্রুফ অব কনসেপ্ট (proof of concept) পর্যায়ে।
প্রকাশনার জালিয়াতি: নেচার (Nature)-এর সতর্কতা এবং ৭৫ পয়েন্টের রহস্য
পেটেন্টের পর আসে গবেষণাপত্র প্রকাশনার (publication) প্রসঙ্গ। আর এখানেও বাস্তব ছবিটা ততটাই উদ্বেগজনক।
২০২২ সালে বিজ্ঞান জগতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ জার্নালগুলির একটি — নেচার (Nature) — একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেছিল। তাতে জানানো হয়, ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ১৬,০০০-এরও বেশি গবেষণাপত্র সততার প্রশ্নে চিহ্নিত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে “পাবলিশ অর পেরিশ” (publish or perish) সংস্কৃতি এখন শিক্ষকদের মূল্যায়নের মাপকাঠি। ফলে তৈরি হয়েছে একটি সমান্তরাল অর্থনীতি — “প্রেডেটরি জার্নাল” (predatory journal)-এ টাকা দিয়ে গবেষণাপত্র ছাপানো। ৫,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা দিলেই যে কোনো মানহীন গবেষণা প্রকাশিত হয়ে যায় এমন জার্নালে যেখানে প্রকৃত পিয়ার রিভিউ (peer review) বলে কিছু নেই। এমনকি “ঘোস্ট রাইটিং” (ghost writing) সার্ভিস প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে — টাকা দিলে লেখকের নাম কিনে নেওয়া যাবে।
কিউএস (QS) এবং টাইমস হায়ার এডুকেশন (Times Higher Education বা THE) র্যাংকিং-এ সাইটেশন (citation)-এর ওজন বেশি। তাই তৈরি হয়েছে “সাইটেশন কার্টেল” (citation cartel) — নেটওয়ার্কভুক্ত প্রতিষ্ঠান ও গবেষকরা পরস্পরের পেপার (paper) সাইট করেন, ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে শিক্ষকদের পেপার সাইট করানো হয়।
এই কারসাজির ফলে তৈরি হয়েছে শিক্ষাবিদরা যাকে বলছেন “৭৫ পয়েন্ট অ্যানোমালি” (75-point anomaly)। বেশ কিছু ভারতীয় টায়ার-২ (tier-2) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় THE র্যাংকিং-এ রিসার্চ কোয়ালিটি (Research Quality) স্কোরে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি (Oxford University) বা ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স (Indian Institute of Science বা IISc)-কে ছাপিয়ে যাচ্ছে। অথচ একই সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানগুলির “রিসার্চ এনভায়রনমেন্ট” (Research Environment) স্কোর তলানিতে।
ফলটা কী দাঁড়াচ্ছে? ২০২৩ সালে একা ভারত থেকে ২,৭০০-এরও বেশি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার (retract) করতে হয়েছে — প্লাগিয়ারিজম (plagiarism), তথ্য জালিয়াতি এবং এআই (AI) সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি “টর্চার্ড ফ্রেজ” (tortured phrase)-এর কারণে। গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের বৈশ্বিক তালিকায় ভারত এখন তৃতীয় স্থানে।
শিক্ষক নিপীড়ন: “স্যালারি লন্ডারিং” (Salary Laundering)-এর অবিশ্বাস্য কারসাজি
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেলটা টিকে থাকে মূলত শিক্ষকদের উপর নিদারুণ আর্থিক শোষণের উপর ভিত্তি করে। এবং সেই শোষণের পদ্ধতি এতটাই সুচতুর যে সাধারণভাবে তা ধরা পড়ে না।
ইউজিসি (UGC) এবং এআইসিটিই (AICTE) নির্ধারিত বেতন স্কেল অনুযায়ী শিক্ষকদের বেতন দেওয়া আইনত বাধ্যতামূলক। কিন্তু শত শত কলেজে চলছে একটি পদ্ধতিগত প্রতারণা — যাকে ভেতরে ভেতরে বলা হচ্ছে “রিফান্ড সিস্টেম” (refund system) বা “স্যালারি অ্যাডজাস্টমেন্ট” (salary adjustment)।
কীভাবে কাজ করে এই কারসাজি?
প্রথমত, কাগজে পূর্ণ ইউজিসি (UGC) মানের বেতন দেখানো হয়। প্রতি মাসে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে নির্ধারিত টাকা — নিরীক্ষার জন্য নিখুঁত ডিজিটাল প্রমাণ তৈরি হয়। তারপর শুরু হয় আসল খেলা।
বেতন জমা পড়ার পরই শিক্ষকদের কাছে আসে মৌখিক নির্দেশ — জমা পড়া টাকার ৪০% থেকে ৬০% ফেরত দিতে হবে। ৫০,০০০ টাকা বেতনের শিক্ষককে ফেরত দিতে হচ্ছেন ২৫,০০০ টাকা। নগদে, অথবা কলেজ কর্তৃপক্ষের আত্মীয়স্বজনের ব্যক্তিগত ইউপিআই (UPI) অ্যাকাউন্টে। কোনো রশিদ নেই, কোনো রেকর্ড নেই।
কেউ প্রতিবাদ করেন না। কারণ চাকরি হারানোর ভয়, অনানুষ্ঠানিক “ব্ল্যাকলিস্টিং” (blacklisting)-এর আতঙ্ক, এবং নিজের ইএমআই (EMI) মেটানোর চাপ। এটিই হল “স্যালারি লন্ডারিং” (salary laundering)।
ভুতুড়ে শিক্ষক: যারা শুধু কাগজে থাকেন
সমস্যা এখানেই শেষ নয়। আরেকটি বিস্ময়কর প্রথা চলছে দেশজুড়ে — “ঘোস্ট ফ্যাকাল্টি” (ghost faculty) বা ভুতুড়ে শিক্ষক।
নিয়মে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত রক্ষা করতে হবে। কিন্তু সেই সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দিতে গেলে বেতনের বোঝা বাড়ে। সমাধান? অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বা একেবারে ভিন্ন পেশায় থাকা মানুষদের আধার কার্ড (Aadhaar card), প্যান কার্ড (PAN card) এবং ডিগ্রি সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে তাঁদের নাম ফুল টাইম স্টাফ (full time staff) হিসেবে নথিভুক্ত করা।
তামিলনাড়ুতে (Tamil Nadu) আন্না ইউনিভার্সিটির (Anna University) সঙ্গে অ্যাফিলিয়েটেড (affiliated) ১০০-এরও বেশি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এই জালিয়াতি ধরা পড়েছে। আরাপ্পোর ইয়াক্কম (Arappor Iyakkam) নামের একটি দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা শত শত ভুতুড়ে শিক্ষকের তথ্য প্রকাশ করেছে।
এরপর আসে “ইন্সপেকশন থিয়েটার” (inspection theatre)। নিয়ামক সংস্থার পরিদর্শন আসার আগেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অন্য জায়গা থেকে অস্থায়ী শিক্ষক ধার করে আনে। পরিদর্শন শেষ হলে তাঁরা ফিরে যান। বাকি ছাত্ররা থাকেন শূন্যের মধ্যে।
৮৩% ইঞ্জিনিয়ার চাকরিহীন: শিক্ষার্থীরা কি পাচ্ছেন?
এতকিছুর মাঝে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন — ছাত্রদের কী হচ্ছে?
ইন্ডিয়া স্কিলস রিপোর্ট ২০২৫ (India Skills Report 2025) এবং বিভিন্ন শিল্পসংস্থার সমীক্ষা একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে:
ভারত প্রতি বছর ১৫ লক্ষ ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করে। তাদের মধ্যে প্রায় ৮৩% পাস করার পর প্রাসঙ্গিক চাকরি বা ইন্টার্নশিপ (internship) পায় না।
আইটি (IT) ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে মাত্র ৯.৯% ভুলমুক্ত ও কম্পাইলযোগ্য (compilable) কোড (code) লিখতে পারেন। অর্থাৎ দশ জনের মধ্যে নয় জন ইঞ্জিনিয়ার কম্পিউটার যন্ত্র যে ভাষা বোঝে, সেভাবে প্রোগ্রাম (program) লিখতে পারেন না।
এআই (AI) ও মেশিন লার্নিং (machine learning)-এর মতো উচ্চ চাহিদার ক্ষেত্রে কাজের উপযুক্ত দক্ষতা রয়েছে মাত্র ২.৫% গ্র্যাজুয়েটের।
এই পরিসংখ্যানটা ভেবে দেখুন একটু ভিন্নভাবে: যে দেশ নিজেকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তার তৈরি করা ইঞ্জিনিয়ারদের মাত্র আড়াই শতাংশ এআই (AI)-র ক্ষেত্রে কাজ করার দক্ষতা রাখেন।
সমস্যার মূলে কী? শিক্ষার্থীরা নিজেই বলছেন — ভাঙা ল্যাবরেটরি (laboratory) সরঞ্জাম, নিরুৎসাহী শিক্ষকদের কাছ থেকে শেখা মুখস্থবিদ্যা, সমালোচনামূলক চিন্তা ও ডিজাইন থিংকিং (design thinking)-এর কোনো সুযোগ নেই। কারিকুলাম (curriculum) বাস্তব শিল্পজগতের থেকে বছরের পর বছর পিছিয়ে।
র্যাংকিং (Ranking)-এর ফাঁদ এবং “মার্কেট লাই ডিটেক্টর” (Market Lie Detector)
গ্লোবাল র্যাংকিং টেবিলে উপরে থাকা মানে কি ভালো শিক্ষা? এই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে একটাই মাপকাঠি — বাজার।
নিরীফ (NIRF) র্যাংকিং শুধু তথ্যনির্ভর নয়, সেখানে অডিটেড (audited) মিডিয়ান স্যালারি (median salary) ডেটাও থাকে। শিক্ষাবিদরা এই ডেটাকে বলছেন “মার্কেট লাই ডিটেক্টর” (Market Lie Detector)।
তুলনাগুলো দেখুন:
শুলিনি ইউনিভার্সিটি (Shoolini University) বনাম আইআইটি গুয়াহাটি (IIT Guwahati) — THE (টাইমস হায়ার এডুকেশন) র্যাংকিং-এ শুলিনি আছে ৪০১-৫০০ ব্যান্ডে, আর আইআইটি গুয়াহাটি ৮০১-১০০০ ব্যান্ডে। কিন্তু আইআইটি গুয়াহাটির মিডিয়ান স্যালারি ১৯.৪৮ লাখ, আর শুলিনি ইউনিভার্সিটির মাত্র ৩.৮৪ লাখ।
সাভিথা ইন্সটিটিউট (Saveetha Institute) বনাম বিআইটিএস পিলানি (BITS Pilani) — THE র্যাংকিং-এ সাভিথা ৩৫১-৪০০ ব্যান্ডে, বিআইটিএস পিলানি ৮০১-১০০০ ব্যান্ডে। অথচ বিআইটিএস পিলানির মিডিয়ান স্যালারি ১৮ লাখ, সাভিথার মাত্র ৪.৭২ লাখ।
এলপিইউ (LPU) বনাম আইআইটি গান্ধীনগর (IIT Gandhinagar) — এলপিইউ র্যাংকিং-এ এগিয়ে, কিন্তু মিডিয়ান স্যালারি ৮ লাখ। আইআইটি গান্ধীনগর র্যাংকিং-এ পিছিয়ে, কিন্তু মিডিয়ান স্যালারি ১৪ লাখ।
বাজার সবসময় সত্য বলে। র্যাংকিং-এ যতই এগিয়ে থাকুক, কোম্পানিগুলো টায়ার-২ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য প্রিমিয়াম (premium) দিতে রাজি নয়। এটাই প্রমাণ করে র্যাংকিং-এর সংখ্যা কতটা ফাঁপা।
১৯ বছরে বেতন বাড়েনি ₹৩,১৬ লাখ থেকে ₹৩,৩৬ লাখ!
এখানে একটু থামতে হবে। কারণ একটা সংখ্যা সামনে রাখলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়।
২০০৭ সালে টিসিএস (TCS)-এ একজন ফ্রেশার ইঞ্জিনিয়ারের বেতন ছিল প্রায় ৩.১৬ লাখ টাকা বার্ষিক। ২০২৬ সালে সেই একই পদে বেতন — ৩.৩৬ লাখ টাকা। উনিশ বছরে নামমাত্র বৃদ্ধি ২০,০০০ টাকা।
অথচ এই সময়কালে বেঙ্গালুরু (Bengaluru), পুনে (Pune)-র মতো আইটি হাবের (IT hub) ভাড়া, খাওয়াদাওয়া, যানবাহন — সব কিছুর খরচ কয়েকগুণ বেড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি (inflation) সমন্বয় করলে একজন তরুণ আইটি ইঞ্জিনিয়ারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ১৫ বছর আগের তুলনায় ৫০ থেকে ৬০% কমে গেছে।
একসময় “আইটি চাকরি” মানে ছিল মধ্যবিত্তের স্বপ্নের উড়ান। আজ সেই চাকরিতে যে বেতন মেলে, গিগ ইকোনমি (gig economy)-র ডেলিভারি পার্টনার (delivery partner) বা ফ্রিল্যান্সার (freelancer) — যাদের চার বছরের ডিগ্রি নেই, কোনো শিক্ষাঋণের (education loan) বোঝাও নেই — তারা অনেকসময় বেশি আয় করছেন।
ইনফোসিস (Infosys), উইপ্রো (Wipro), এইচসিএলটেক (HCLTech)-এর মতো বড় কোম্পানিগুলো যেসব ফ্রেশার নিচ্ছে, তাদের প্রায় সবাইকে নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে হচ্ছে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কাজের উপযুক্ত ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করতে পারছে না। এই বাড়তি প্রশিক্ষণের খরচ পরিণামে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে কর্মীদের উপরই — বেতন না বাড়িয়ে।
শিক্ষাঋণের বোমা: এনপিএ (NPA) সংকট আসছে
একটি বিটেক (B.Tech) ডিগ্রির খরচ ২০১০ সালের পর থেকে প্রায় চারগুণ হয়ে গেছে। আজ একটি সাধারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে টিউশন ফি (tuition fee), হোস্টেল খরচ এবং নানা লুকানো চার্জ মিলিয়ে ১০ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে।
ফলে শিক্ষাঋণের (education loan) বাজার বিস্ফোরণ ঘটেছে। ২০২৩ সালে এই বাজারের আকার ছিল ৬৭,৮০০ কোটি টাকা, ২০২৯ সালের মধ্যে এটি ২ লাখ কোটি ছাড়াবে বলে অনুমান।
কিন্তু সেই ঋণ মেটানোর মতো বেতন পাচ্ছেন না বেশিরভাগ গ্র্যাজুয়েট। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (Reserve Bank of India বা RBI) এবং ইন্ডিয়ান ব্যাংকস অ্যাসোসিয়েশন (Indian Banks’ Association বা IBA)-এর তথ্য বলছে, শিক্ষাঋণে নন-পার্ফর্মিং অ্যাসেটের (Non-Performing Asset বা NPA) অনুপাত ক্রমশ বাড়ছে।
এই সংকট সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। এটি কেন্দ্রীভূত টায়ার-২ ও টায়ার-৩ বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যেই। যেখানে ডিগ্রির “রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট” (return on investment) এখন কার্যত নেতিবাচক।
ব্যাংকগুলো এখন এই ঝুঁকি টের পাচ্ছে। আইআইটি (IIT), এনআইটি (NIT), আইআইএম (IIM)-এর মতো প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের ঋণ সহজেই পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু সাধারণ বেসরকারি কলেজের জন্য আবেদনে কঠোর শর্ত জুড়ছে ব্যাংক — জামানত চাই, কো-সাইনার (co-signer) চাই, জীবন বিমাও করতে হবে। এই পরিস্থিতি দেশের সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোকে উচ্চশিক্ষার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে, মধ্যবিত্তকে দেউলিয়া করছে।
অলাভজনকের মুখোশে কোটি টাকার ব্যবসা
ভারতের সংবিধান ও আইন অনুযায়ী, স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হয় অলাভজনক ট্রাস্ট (trust) বা সোসাইটি (society)-র মাধ্যমে। উদ্দেশ্য — শিক্ষা থেকে আয়ের সমস্ত অর্থ আবার শিক্ষায় বিনিয়োগ হবে।
কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে?
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতারা একটি নিখুঁত কর্পোরেট কাঠামো (corporate structure) তৈরি করেছেন। ট্রাস্ট (অলাভজনক) ক্যাম্পাসটি পরিচালনা করে, কিন্তু জমি ও বিল্ডিং মালিকানায় থাকে প্রতিষ্ঠাতাদের পরিবারের নামে একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির (private limited company)। সেই কোম্পানি ট্রাস্টকে বাজার-দরের চেয়ে অনেক বেশি ভাড়ায় ক্যাম্পাস ভাড়া দেয়। রাজ্য সরকার থেকে প্রায় বিনামূল্যে পাওয়া জমিতে গড়া ক্যাম্পাস থেকে কোটি কোটি টাকার ভাড়া উঠছে ট্রাস্টের পেট কেটে।
এর সঙ্গে যোগ হয় “ক্যাপ্টিভ ভেন্ডর” (captive vendor) ব্যবস্থা। হোস্টেল, ক্যান্টিন, বাস, ইউনিফর্ম, পাঠ্যবই, আইটি পরিকাঠামো — সব কিছু কেনা হচ্ছে প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো থেকে, বাজারের চেয়ে অনেক বেশি দামে।
এই মডেল এতটাই নির্ভরযোগ্য মুনাফা দেয় যে বিদেশি প্রাইভেট ইকুইটি (Private Equity বা PE) ফার্মগুলো এখন ভারতের শিক্ষাক্ষেত্রে বড় লগ্নিকারী। তাদের কাছে এটি “রিসেশন-প্রুফ গোল্ডমাইন” (recession-proof goldmine)। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি বাড়ছে বছরে ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ। কারণ সেটা পিই (PE) রিটার্নের (return) হিসাব, শিক্ষার হিসাব নয়।
২০২৪-এর রাজনৈতিক প্রহসন: রোবোডগের আগেও ছিল বিড়ম্বনা
ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিটের কাণ্ডটি গালগোটিয়াসের প্রথম জাতীয় বিব্রত নয়। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের (Lok Sabha election) আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্র কংগ্রেসের (Congress) জাতীয় সদর দফতরের বাইরে প্রতিবাদ বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন। কিন্তু সাংবাদিকরা যখন তাদের বিক্ষোভের কারণ জিজ্ঞেস করলেন, তখন বেরিয়ে এল আসল চিত্র — ছাত্ররা জানেনই না কেন এসেছেন।
“আরবান নকশালিজম” (urban naxalism) শব্দটি উচ্চারণ করতে গিয়ে তারা যেভাবে হোঁচট খেলেন, সেই ক্লিপ মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল (viral) হয়। দেশজুড়ে মিম (meme) ছড়িয়ে পড়ল।
ঘটনা দুটোকে পাশাপাশি রাখলে একটা গভীর প্যাটার্ন (pattern) স্পষ্ট হয় — ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মাঝে মাঝে “প্রপ” (prop) বা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কখনো বিপণন প্রদর্শনীতে, কখনো রাজনৈতিক মঞ্চে। তাঁরা জানেন না সেই রোবটের উৎস কোথায়, বা তাঁরা জানেন না কেন বিক্ষোভ করতে হচ্ছে।
অ্যাক্রিডিটেশন কনসালট্যান্সি (Accreditation Consultancy): জালিয়াতির পরামর্শদাতা
এই পুরো ব্যবস্থাটি টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে একটি নতুন শিল্প — “অ্যাক্রিডিটেশন কনসালট্যান্সি” (accreditation consultancy)।
অ্যাক্রিডিটেশনএজ (AccreditationEdge), ধ্রুবসত্য (DhruvSatya), টিম এনআইসি (Team NIC)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলি প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে — তারা টায়ার-২ ও টায়ার-৩ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ন্যাক(NAAC) “এ++” গ্রেড এবং এনবিএ (NBA) অ্যাক্রিডিটেশন পেতে সাহায্য করবে।
কীভাবে? তারা শিক্ষার মান উন্নয়ন করে না। তারা শেখায় কীভাবে কাগজপত্র সাজাতে হয়, কীভাবে সেলফ-স্টাডি রিপোর্ট (Self-Study Report বা SSR) লিখতে হয় ন্যাক(NAAC)-এর অ্যালগরিদমের (algorithm) সঙ্গে মিলিয়ে, কীভাবে পরিদর্শনের দিন ক্যাম্পাস সাজিয়ে “ইন্সপেকশন থিয়েটার” মঞ্চায়িত করতে হয়।
অ্যাক্রিডিটেশন পেলেই সেটা মার্কেটিং ক্যাম্পেইনে (marketing campaign) ব্যবহার হয়। পরের বছর আরও বেশি ভর্তি। আরও বেশি ফি।
নিয়ন্ত্রকের ভেতরেই দুর্নীতি: সিবিআই (CBI) অভিযান
ব্যবস্থার পরিবর্তন আনতে পারত নিয়ামক সংস্থাগুলো। কিন্তু সেখানেও ঢুকে গেছে দুর্নীতির হাত।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (Central Bureau of Investigation বা CBI) একটি ন্যাক(NAAC) পরিদর্শন কমিটির চেয়ারম্যান-সহ ছয়জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ — একটি শিক্ষা ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে প্রায় ৫০ লাখ টাকার নগদ, সোনা ও ইলেক্ট্রনিক্স (electronics) ঘুষ নিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানকে “এ++” গ্রেড দিয়েছেন।
ইউজিসি (UGC) কেলেঙ্কারিও কম নয়। একজন সাবেক ইউজিসি (UGC) চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের (Health Ministry) কর্মকর্তা এবং বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ (medical college) মালিকদের মধ্যে গোপন আঁতাত উন্মোচিত হয়েছে — যেখানে পরিদর্শনের গোপন সময়সূচি ফাঁস করা হত, ভুতুড়ে রোগি রেখে হাসপাতাল সাজানো হত, বায়োমেট্রিক (biometric) সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করা হত।
সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) হস্তক্ষেপ এবং নতুন আইনের সম্ভাবনা
নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার এই গভীরতা শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট অব ইন্ডিয়া (Supreme Court of India)-কে হস্তক্ষেপে বাধ্য করেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে একটি ছাত্রের ব্যক্তিগত অভিযোগ থেকে জনস্বার্থ মামলায় (Public Interest Litigation বা PIL) পরিণত হয়েছে গোটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ক তদন্ত। আদালত ক্যাবিনেট সেক্রেটারি (Cabinet Secretary), সমস্ত রাজ্যের মুখ্যসচিব এবং ইউজিসি (UGC) চেয়ারম্যানের কাছ থেকে ব্যক্তিগত হলফনামা চেয়েছেন।
একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার একটি বড় সংস্কারের পথে হাঁটছে। “বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল ২০২৫” (Viksit Bharat Shiksha Adhikshan Bill 2025) — যা আগে “হায়ার এডুকেশন কমিশন অব ইন্ডিয়া” (Higher Education Commission of India বা HECI) বিল নামে পরিচিত ছিল — সেটি ইউজিসি (UGC), এআইসিটিই (AICTE) ও এনসিটিই (NCTE)-কে ভেঙে দিয়ে একটি একক জাতীয় কমিশনে একীভূত করার প্রস্তাব রাখছে।
পথ কোথায়: সংস্কারের রূপরেখা
অনুসন্ধানী রিপোর্টটি শুধু সমস্যার তালিকায় থেমে থাকেনি। এর পাশাপাশি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কারের প্রস্তাবও দিয়েছে:
প্রথমত, র্যাংকিং ও অ্যাক্রিডিটেশনে “আউটকাম-বেসড ফান্ডিং” (outcome-based funding)-এ যেতে হবে। পেটেন্ট ফাইল করলেই পয়েন্ট নয় — পেটেন্ট বাণিজ্যিক লাইসেন্স পেলে বা TRL ৭-এ পৌঁছলে তবেই স্বীকৃতি মিলবে।
দ্বিতীয়ত, ভুতুড়ে শিক্ষকের সমস্যা সমাধানে সারা দেশে রিয়েল-টাইম ফেস-বেসড বায়োমেট্রিক (face-based biometric) সিস্টেম চালু করতে হবে, সরাসরি এআইসিটিই (AICTE) ও ইউজিসি (UGC)-র কেন্দ্রীয় পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত।
তৃতীয়ত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক হিসাব ক্যাগ (Comptroller and Auditor General বা CAG) অডিটের আওতায় আনতে হবে। রিলেটেড-পার্টি ট্রানজেকশন (related-party transaction) — অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাতার কোম্পানিকে টাকা দেওয়া — কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় বিজ্ঞাপন ও প্লেসমেন্ট দাবিকে কনসিউমার প্রোটেকশন (consumer protection) আইনের অধীনে আনতে হবে। ইপিএফও (Employees’ Provident Fund Organisation বা EPFO) ও আয়কর তথ্যের সাথে মিলিয়ে যাচাই করা মিডিয়ান স্যালারি প্রকাশ করতে হবে।
পঞ্চমত এবং সবচেয়ে সাহসী প্রস্তাব হল — “নন-প্রফিট” (non-profit) কাঠামোর ভণিতা ছেড়ে সঠিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে লাভজনক (for-profit) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনাকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া। এতে কমপক্ষে আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা আসবে, “স্যালারি লন্ডারিং”-এর প্রয়োজনই থাকবে না।
উপসংহার: বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছে — ব্যবস্থাটা কবে?
গালগোটিয়াসের সেই রোবোডগটি এখন আর মঞ্চে নেই। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, প্যাভিলিয়ন গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে ব্যবস্থা ওই রোবটকে “দেশীয় উদ্ভাবন” বলার সাহস দিয়েছিল, সেই ব্যবস্থাটা এখনো চলছে। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী চকচকে ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকছেন, কয়েক লাখ টাকার ঋণ নিয়ে চার বছর কাটাচ্ছেন, এবং বেরিয়ে আসছেন এমন একটি দুনিয়ায় যেখানে তাদের ডিগ্রির বাজারমূল্য নেই, দক্ষতা নেই, আর হাতে আছে শুধু শোধ না করা ঋণের বোঝা।
ভারতের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড (demographic dividend)-এর স্বপ্নটা তাহলে কে দেখছে? নিশ্চিতভাবে সেই লক্ষ শিক্ষার্থীরা নয়, যাঁদের ডিগ্রিতে শিক্ষার নাম মাত্র আছে। ভারতের উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন — বাস্তবের কষ্টিপাথরে ঘষে দেখার।
সংখ্যায় পেটেন্ট, র্যাংকিং টেবিলে উজ্জ্বল নাম, বিলবোর্ডে বড় বড় প্রতিশ্রুতি — এই মুখোশের আড়ালে যদি সত্যিকারের শিক্ষা না থাকে, তাহলে সেটা শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয় — এটা একটি জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে করা প্রতারণা।
