স্থলে জলে বনতলে... নিউজস্কোপ-এর নিবেদন
দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে বসন্ত উৎসব। শান্তিনিকেতন (Santiniketan) থেকে কলকাতা (Kolkata)—সর্বত্রই এখন রঙের প্রস্তুতি। কিন্তু উৎসবের এই আনন্দ কি ফিকে হয়ে যেতে পারে আপনার ত্বকের সমস্যায়? কয়েক দশক ধরে বাজারে ছেয়ে থাকা সস্তা রাসায়নিক আবির আমাদের অজান্তেই ডেকে আনছে বড় বিপদ। তবে আশার কথা হলো, আধুনিক সময়ে মানুষ আবার ফিরে যাচ্ছে প্রকৃতির কোলে। বিষাক্ত কেমিক্যাল ছেড়ে এখন বিবর্তন ঘটছে ভেষজ বা অর্গানিক আবিরের (Herbal or Organic Abir)।
রাসায়নিক আবিরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিপদ
সাধারণত বাজারে যে কম দামি উজ্জ্বল রঙের আবির পাওয়া যায়, তা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও তার উপাদান অত্যন্ত ভয়ংকর। গবেষণায় দেখা গেছে, কালো রঙের আবিরে মেশানো থাকে লেড অক্সাইড (Lead oxide), সবুজ রঙে থাকে কপার সালফেট (Copper sulphate), রূপালি রঙে অ্যালুমিনিয়াম ব্রোমাইড (Aluminium bromide) এবং টকটকে লাল রঙে থাকে মারকারি সালফাইট (Mercury sulphite)।
এগুলি শুধুমাত্র ত্বকের ক্ষতি করে না, বরং ডার্মাটাইটিস (Dermatitis), চোখের অ্যালার্জি এমনকি ক্যানসারের মতো মারণ রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া এই ধরণের আবিরে ফিল্টার হিসেবে ব্যবহার করা হয় অ্যাসবেস্টস (Asbestos) বা ট্যালকাম পাউডার, যা নিঃশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করে ফুসফুসের ক্ষতি করতে পারে। অনেক সময় জেল্লা বাড়ানোর জন্য এতে মাইকা (Mica) মেশানো হয়, যা চোখের কর্নিয়ার মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
ভেষজ আবিরের জাদুকরী রূপান্তর
বর্তমান সময়ে সচেতন মানুষ বেছে নিচ্ছেন ভেষজ আবির। এটি তৈরি হয় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রঞ্জক এবং উদ্ভিজ্জ উপাদান দিয়ে। এই আবির শুধু নিরাপদই নয়, এতে থাকা অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি (Anti-inflammatory) এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট (Antioxidant) উপাদান ত্বকের সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করে।
প্রাকৃতিক উপায়ে আবির তৈরির পদ্ধতিটিও বেশ চমৎকার। এক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিকারক ট্যালক ব্যবহার না করে বেস বা আধার হিসেবে অ্যারোরুট পাউডার (Arrowroot powder), ভুট্টার আটা বা কর্ন ফ্লাওয়ার (Corn flour) কিংবা বেসন (Gram flour) ব্যবহার করা হয়।
প্রকৃতি থেকে যেভাবে আসে রঙ:
হলুদ (Yellow): হলুদ গুঁড়োর সাথে বেসন মিশিয়ে তৈরি হয় চমৎকার হলদে আবির।
লাল বা গোলাপি (Red/Pink): বিট (Beetroot) থেকে নির্যাস বের করে বা জবা (Hibiscus) ও গোলাপ (Rose) ফুলের পাপড়ি শুকিয়ে এই রঙ তৈরি হয়।
সবুজ (Green): নিম পাতা (Neem), হেনা (Henna) বা গুলমোহর (Gulmohar) পাতা শুকিয়ে গুঁড়ো করে পাওয়া যায় প্রাকৃতিক সবুজ।
কমলা (Orange): পলাশ (Palash) বা তেসু (Tesu) ফুল এবং সিঁদুর রাগা (Bixa orellana) বীজ থেকে পাওয়া যায় স্নিগ্ধ কমলা রঙ।
ঘরে বসেই বানিয়ে ফেলুন নিজের আবির
পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে আমরা অনুসন্ধান করে দেখেছি, আবির তৈরির প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ। প্রথমে ফুল বা প্রাকৃতিক উপাদানগুলো সংগ্রহ করে তা জলে সেদ্ধ করে বা পিষে নির্যাস বের করা হয়। এরপর সেই রঙের সাথে অ্যারোরুট বা স্টার্চ মিশিয়ে একটি পেস্ট তৈরি করা হয়। এই মিশ্রণটি হালকা রোদে শুকিয়ে নেওয়ার পর যখন তা শক্ত হয়ে যায়, তখন সেটিকে মিহি করে পিষে নিলেই তৈরি হয়ে যায় মোলায়েম ভেষজ আবির।
কৃত্রিম রঙ থেকে বাঁচার উপায়
যদি ভুলবশত রাসায়নিক রঙ ত্বকে লেগে যায়, তবে তা তোলার জন্য ঘরোয়া টোটকা ব্যবহার করা যেতে পারে। ২ টেবিল চামচ বেসন (Gram flour) এবং ১ টেবিল চামচ দই (Curd) মিশিয়ে ত্বকে ১০ মিনিট লাগিয়ে রেখে ধুয়ে ফেললে জেদি রঙ সহজেই উঠে যায়।
এবারের হোলি (Holi) হোক শুধুই আনন্দের। কৃত্রিম নিয়ন রঙের হাতছানি এড়িয়ে মাটির কাছাকাছি থাকা ভেষজ আবিরেই রাঙিয়ে তুলুন আপনার আপনজনদের। মনে রাখবেন, সচেতনতাই পারে উৎসবকে নিরাপদ ও সার্থক করে তুলতে।

