ভারত–যুক্তরাজ্য কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড এগ্রিমেন্ট–এর আওতায় কলকাতা থেকে যুক্তরাজ্যে গয়না রপ্তানির প্রথম চালান পাঠানো হল
ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তির অধীনে ₹২৭ কোটির প্রথম রপ্তানিতে অংশ নিল কলকাতার ৬ রপ্তানিকারক সংস্থা
ভারত–যুক্তরাজ্য কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড এগ্রিমেন্ট (CETA)–এর আওতায় ভারতের রপ্তানি যাত্রায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসাবে আজ কলকাতা এয়ার কার্গো কমপ্লেক্স থেকে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে প্রথম গয়না রপ্তানির চালান পাঠানো হল। প্রায় ₹২৭ কোটি মূল্যের এই চালানটি CETA–র আওতায় যুক্তরাজ্যে পাঠানো ১ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের দেশের প্রথম গয়না রপ্তানির অংশ রয়েছে।
পতাকা প্রদর্শনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের শিল্প ও বাণিজ্য দফতরের মন্ত্রী শ্রী তাপস রায়, কাস্টমস বা শুল্ক দফতরের সদস্য শ্রী যোগেন্দ্র গর্গ, বৈদেশিক বাণিজ্য দফতরের (DGFT) অতিরিক্ত মহাপরিচালক শ্রী চন্দ্রকান্ত মিশ্র, পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্রিটিশ উপ-হাইকমিশনার ড. অ্যান্ড্রু ফ্লেমিং, জেম অ্যান্ড জুয়েলারি এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিল (GJEPC)–এর পূর্বাঞ্চলীয় চেয়ারম্যান শ্রী পঙ্কজ পারেখ এবং SHEFEXIL–এর কার্যনির্বাহী অধিকর্তা ড. দেবযানী রায়।
কলকাতার ছয়টি শীর্ষ রপ্তানিকারক সংস্থা—জাইস জুয়েলারি প্রাইভেট লিমিটেড, মডার্ন ইমপেক্স, এল. গোপাল অ্যান্ড সন্স (জুয়েলার্স), এবি জুয়েলস প্রাইভেট লিমিটেড, জেএস জুয়েলস প্রাইভেট লিমিটেড এবং হাসমুখ পারেখ জুয়েলার্স – এই প্রথম রপ্তানিতে অংশ নিয়েছে। এই চালানটিতে সোনা, হিরে, রুপো এবং প্ল্যাটিনামের গয়না রয়েছে।
একই অনুষ্ঠানে ভারত–যুক্তরাজ্য CETA–র আওতায় ব্ল্যাক টি, দার্জিলিং চা, কফি এবং প্রায় ৩,০০০ কিলোগ্রাম পানপাতা–র রপ্তানি করা হয় যুক্তরাজ্যে, যেটি পশ্চিমবঙ্গের বহুমুখী রপ্তানি সম্ভাবনার সাক্ষ্য বহন করে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বৈদেশিক বাণিজ্য দফতরের অতিরিক্ত মহানির্দেশক শ্রী চন্দ্রকান্ত মিশ্র বলেন, ভারত–যুক্তরাজ্য CETA দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে এবং পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের রপ্তানিকারকদের জন্য উল্লেখযোগ্য সুযোগ সৃষ্টি করতে চলেছে। তিনি এও বলেন,
“এই চুক্তি পশ্চিমবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য একটি গেমচেঞ্জার হবে। রত্ন ও গয়না, চামড়াজাত পণ্য, সামুদ্রিক পণ্য, পাট এবং ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়া যাবে, যার ফলে, এই অঞ্চলকে বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে সুদৃঢ়ভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে।”
পশ্চিমবঙ্গের রপ্তানি সক্ষমতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শ্রী মিশ্র বলেন, যুক্তরাজ্যে ভারত থেকে রত্ন ও গয়না, সামুদ্রিক পণ্য এবং পাট পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। শুল্ক প্রত্যাহারের ফলে এই ক্ষেত্রগুলির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত অঞ্চলের ব্রিটিশ উপ-হাইকমিশনার ড. অ্যান্ড্রু ফ্লেমিং এই অনুষ্ঠানকে ভারত–যুক্তরাজ্য বাণিজ্যিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আজ আমরা শুধু কলকাতা থেকে পন্য রপ্তানি করছি না; আমরা এই বার্তাও দিচ্ছি যে ভারত–যুক্তরাজ্য কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক অ্যান্ড ট্রেড এগ্রিমেন্ট ( পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চুক্তি) কাগজ থেকে বাস্তবে রূপ পেয়েছে। এই চুক্তি ব্যবসার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে, কর্মসংস্থান বাড়াবে এবং পশ্চিমবঙ্গের সমৃদ্ধিকে আরও শক্তিশালী করবে।”
তিনি আরও বলেন, গয়না, উৎকৃষ্ট মানের চা, কফি এবং পানপাতা—এই সব পণ্য একসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের কারুশিল্পের উৎকর্ষ এবং কৃষি ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরছে। তিনি আশা প্রকাশ করে আর-ও বলেন,
“এই রপ্তানি কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম চালান হিসাবে নয়, অসংখ্য পন্যের রপ্তানির সূচনা হিসাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং পূর্ব ভারতের সার্বিক বাণিজ্যে আরও মজবুত অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করবে।”
কাস্টমস–এর সদস্য শ্রী যোগেন্দ্র গর্গ বলেন, ভারত–যুক্তরাজ্য CETA–র আওতায় এই প্রথম রপ্তানি ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার সূচক। তিনি বলেন, “এটি শুধু পণ্যের যাত্রা নয়, সম্ভাবনারও যাত্রা। এই চুক্তি রূপায়িত হওয়ায় একটি বৃহৎ ও উচ্চমূল্যের বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ ঘটবে এবং স্থানীয় সক্ষমতাকে বিশ্বব্যাপী সাফল্যে রূপান্তরিত করার পাশাপাশি, প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং যৌথ সমৃদ্ধির নতুন পথ সৃষ্টি করবে।”
ভারত–যুক্তরাজ্য CETA রূপায়িত হওয়ায় ভারতীয় রত্ন ও গয়না যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে। এর মাধ্যমে আমদানি শুল্ক সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ পর্যন্ত প্রত্যাহার হওয়ায় ভারতীয় গয়নার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
GJEPC–এর চেয়ারম্যান শ্রী কিরীট ভনসালি বলেন, এই চুক্তি যুক্তরাজ্যে ভারতের রত্ন ও গয়না রপ্তানিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। তিনি বলেন,
“শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারে আগামী তিন বছরে যুক্তরাজ্যে ভারতের রত্ন ও গয়না রপ্তানি বর্তমান প্রায় ৭৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে আমরা আশা করছি। এর ফলে, রপ্তানিকারক, উৎপাদক, MSME, কারিগর এবং ডিজাইনারদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।”
GJEPC–এর পূর্বাঞ্চলীয় চেয়ারম্যান শ্রী পঙ্কজ পারেখ বলেন, গয়না নির্মাণ ও কারুশিল্পে কলকাতার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এই চুক্তির সুফল গ্রহণে বিশেষ সহায়ক হয়ে উঠবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, CETA রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক সুযোগ সৃষ্টি করবে এবং উৎকৃষ্ট মানের গয়না ও কারুশিল্পের নিরিখে ভারতের সুনাম আরও সুদৃঢ় করবে।
ভারত–যুক্তরাজ্য CETA পশ্চিমবঙ্গের রত্ন ও গয়না ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বাজারে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি, মূল্য সংযোজিত পন্য উৎপাদনে উৎসাহ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কারিগর, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (MSME) এবং রপ্তানিকারকদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। প্রথম চালান সফলভাবে হয়ে ওঠায় ভারতের গয়না রপ্তানিতে কলকাতার ধারাবাহিক অবদান আরও একবার প্রতিফলিত হল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের উপস্থিতি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসাবে চিহ্নিত হল।


Recent Comments