জীবনানন্দের নীরব উঠোনে—স্মৃতি আছে, দাবীও আছে
কমল সেনগুপ্ত
জীবনানন্দ সড়ক ধরে হাঁটছিলাম হঠাৎ মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল শালিখ, দূরে একজোড়া সাদা বক নেমে এলো নীরব উঠোনে। আর সেই নিঃশব্দ দুপুরে, হঠাৎ নজরে পড়ল ‘ধানসিড়ি’, একটি বাড়ীর নামফলক, চমকে উঠলাম—এখানেই তো ছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। এই ভিটেতেই জন্ম নিয়েছিল বনলতা সেনের সেই মৃদু, স্নিগ্ধ নিঃশ্বাস; যেন শত সহস্র বছরের ক্লান্ত পথিকের বুকে হঠাৎ নেমে আসা প্রশান্তির ছায়া। অন্তরের গভীর অরণ্যে হঠাৎ জেগে উঠেছিল এক চিরন্তন অনুভূতি—’বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’। আবেগে আপ্লুত হয়ে গেলাম।




কবি জীবনানন্দ দাশের সেই স্মৃতির ভিটে—বরিশালের জীবনানন্দ সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা এক সময়ের শান্ত, গোলপাতার ঘর—আজ আর নেই। কিছু অংশে আছে উঁচু তলা ভবন, কিছু অংশে সরকারি স্থাপনা, এক কোনে, ‘কবি জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি মিলনায়তন ও পাঠাগার’। এই বরিশালে কবির জন্ম, বেড়ে ওঠাও। তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরের গৌপাড়া গ্রামে। পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্তের চাকরির সুবাদে বরিশালে বসতি, বরিশালেই পারিবারিক বিস্তৃতি।
কবি জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারী শহরের কালীবাড়ী রোডে জন্মগ্রহন করেন। অশ্বিনীকুমার দত্তের বাড়ির উল্টোদিকেই তাদের পরিবার থাকতেন। পিতা সত্যানন্দ দাশ ও মাতা কুসুমকুমারী দাশ। ১৯০৩ সালে জীবনানন্দের বাবা সত্যানন্দ দাশ, কাকা হরিচরণ দাশ সহ সকল কাকারা মিলে বর্তমান জীবনানন্দ সড়কে জমি কিনে একটি ঘর তৈরি করেন। বাবা সর্বানন্দের নামানুসারে বাড়ির নামকরণ হয় ‘সর্বানন্দ ভবন’। জীবনানন্দ দাশের বাল্যশিক্ষার সূত্রপাত বাড়িতে, মায়ের কাছেই। তারপর ব্রজমোহন স্কুলে ভর্তি হন তিনি।
১৯১৫ সালে মেট্রিক, ১৯১৭ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে আইএ, ১৯১৯ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন কবি জীবনানন্দ দাশ। ১৯২২ সালে কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। ১৯২৯ সালে খুলনা জেলার বাগেরহাট কলেজে কিছুদিন অধ্যাপনা করেন। বছরের শেষদিকে যোগ দেন দিল্লির রামযশ কলেজে। ১৯৩০ সালের মে মাসে চাকরি ছেড়ে দেশে ফেরেন জীবনানন্দ দাশ। ওই বছরই বিয়ে করেন লাবণ্য গুপ্তকে। ১৯৩৫ সালে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে যোগ দেন জীবনানন্দ দাশ। ১৯৪৬ সালের ৮ জুলাই কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে কলকাতা যান তিনি। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আর বরিশালে ফেরেননি।
কবি হলেন দেশান্তরী। পড়ে রইলো শূন্যভিটা। বাড়ির বর্তমান মালিক আবদুল জলিল জানান, আমার বাবা আবদুর রাজ্জাক সরকারের কাছ থেকে ৯৭ শতাংশ জমি নিলাম খরিদ করে। আমরা বর্তমানে ৩০/৩৫ শতাংশে আছি। বাকী জমি সরকার অধিগ্রহণ করে। কবির পরিবারের কাউকে আমি দেখিনি। শুনেছি জীবনানন্দ দাশ বিয়ের পর পুকুর পাড়ে একটি গোলের ঘরে বসবাস করতেন। কবির স্মৃতি রক্ষার্থে আমরা বাড়ির নাম রেখেছি ধানসিড়ি’। বর্তমানে এখানে কয়েকটি বহুতল ভবন, সরকারি স্থাপনা ও একটি জল উত্তোলন প্রকল্প রয়েছে।
বরিশালের লেখক কবি ও সংস্কৃতজনদের দাবি বাড়িটিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংরক্ষণের। আন্দোলন হয়েছে, মানববন্ধন হয়েছে, সভা-সমাবেশও হয়েছে। অবশেষে কবির নামে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জীবনানন্দ দাশ পাঠাগার ও মিলনায়তন’। কিন্তু পাঠাগারের দুয়ার থাকে বন্ধ।
সাবেক অধ্যক্ষ ও জীবনানন্দ গবেষক তপংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘ভিটেটুকু ছাড়া বরিশালে জীবনানন্দ দাশের কোন স্থায়ী স্মৃতি নেই’। তিনি জন্মভিটায় কবি জীবনানন্দ দাশের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার দাবী জানান। উঁচু ভবনগুলো যেখানে মূলতঃ সেখানেই ছিল কবির ভিটা। কবির ছিল যৌথ পরিবার। বর্তমানে জীবনানন্দের কোন বংশধরও এখানে বাস করে না। বাড়ীর পেছনে পুকুর ছিল তাও এখন ভরাট।
বাড়ীর নাম ‘ধানসিড়ি’তে জড়িয়ে আছে কবির স্মৃতি। বগুড়া রোডের নাম ‘জীবনানন্দ সড়ক’, কবির স্মৃতি বিজড়িত ব্রজমোহন কলেজে আছে কবি জীবনানন্দ দাশ চত্ত্বর আর হিন্দু ছাত্রদের জন্য কবি জীবনানন্দ দাশ ছাত্রাবাস, ছাত্রাবাসে আছে পাঁচ তলা বিশিষ্ট ‘শঙ্খচিল ভবন’।
বরিশালে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হয়। সম্প্রতি ব্রজমোহন বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জীবনানন্দ জন্মজয়ন্তী উদযাপন পর্ষদ কবির লেখা পাঁচটি গান সুরারোপ করে প্রথমবারের মত পরিবেশন করে। সরকারি ব্রজমোহন কলেজ প্রাঙ্গণে প্রতিবছর সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘উত্তরণ’ আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তিন দিনব্যাপী জীবনানন্দ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বরিশাল কবিতা পরিষদ ও প্রগতি লেখক সংঘ জীবনানন্দ মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও কবিতা পাঠ করে।
জীবনানন্দ সড়ক, এ পথে একদিন হাঁটতেন কবি । পথে পথে আছে নীরব পদচিহ্ন। ভিটেমাটি নেই, পুকুর ভরাট—তবু মনে হয় কুয়াশার নরম চাদর ভেদ করে একদিন জীবনানন্দ ফিরবেন, কার্তিকের নবান্নের দেশে। বরিশালের আকাশে আজও বাজে ’আবার আসিব ফিরে’-এক স্বপ্নমাখা দীর্ঘশ্বাস। দীর্ঘশ্বাস আর অদম্য প্রত্যাশার শেষে ভেসে আসে নরম স্বপ্নময় আলো; আকাশে হঠাৎ শালিখ ডানা ঝাপটালে মনে হয়—এই বুঝি কবি আবার ফিরে এলেন।

