দীর্ঘ ১৫ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম। দিন নেই, রাত নেই, রোগীদের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন তাঁরা। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। কাটোয়া (Katwa) মহকুমা হাসপাতালে কর্মরত ১২ জন রোগী সহায়ক কর্মীকে এক লহমায় ‘অননুমোদিত’ তকমা দিয়ে ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আর এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে হাসপাতাল চত্বরে।হঠাৎ ছাঁটাই এবং কর্মীদের ক্ষোভমঙ্গলবার দুপুরে রোগী কল্যাণ সমিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
চাকরি যাওয়ার খবর পেয়েই কান্নায় ও ক্ষোভে ফেটে পড়েন ওই ১২ জন মহিলা কর্মী। তাঁরা সরাসরি পুরসভার চেয়ারম্যানকে ঘিরে ধরে তুমুল বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁদের একটাই প্রশ্ন, “টানা ১৫ বছর ধরে আমরা এই হাসপাতালে রোগীদের সেবা করে আসছি। আমাদের যৌবনের অনেকটা সময় এখানেই কেটেছে।এত দিন পর হঠাৎ করে কেন আমাদের ‘অননুমোদিত’ বলে ঘোষণা করা হবে? আমাদের পরিবারগুলো এখন কীভাবে চলবে?”
এই মহার্ঘ্যতার যুগে কাজ হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এই মহিলারা। এতদিন ধরে নামমাত্র পারিশ্রমিকে কাজ করার পরেও তাঁদের আশা ছিল, হয়তো একদিন তাঁদের কাজের সরকারি স্বীকৃতি মিলবে। কিন্তু মঙ্গলবারের একটি নির্দেশিকা তাঁদের সেই স্বপ্ন চুরমার করে দিয়েছে।কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হল রোগী কল্যাণ সমিতির বৈঠকে?
জানা গিয়েছে, মঙ্গলবারের ওই বিশেষ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের সুপার বিপ্লব মণ্ডল (Biplab Mandal), মহকুমাশাসক এবং পূর্ত দপ্তরের (Public Works Department) ইঞ্জিনিয়াররা। সেখানেই জানানো হয় যে, রাজ্য সরকারের শীর্ষ স্তর থেকে কড়া নির্দেশিকা এসেছে। কোনও সরকারি হাসপাতালে কোনওভাবেই ‘অননুমোদিত’ বা বেআইনিভাবে নিয়োগ হওয়া কর্মীদের রাখা যাবে না। সেই নির্দেশিকা মেনেই এই ১২ জনকে অবিলম্বে কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, যাঁরা অনুমোদিত কর্মী রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কাজের সময় বা ডিউটি নতুন করে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে যাতে রোগীর পরিষেবায় কোনও ব্যাঘাত না ঘটে।বেতন নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য ও এনজিও-র ভূমিকাকিন্তু কীভাবে এই ১২ জন কর্মী এতদিন ধরে কাজ করছিলেন? এর নেপথ্যে রয়েছে একটি জটিল এবং চাঞ্চল্যকর ব্যবস্থা।
হাসপাতাল সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর (State Health Department) থেকে কাটোয়া মহকুমা হাসপাতালে রোগী সহায়ক পদে মাত্র আট জনের কাজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, কাটোয়া পুরসভা পরিচালিত ‘অজয় সমষ্টি উন্নয়ন’ (Ajoy Samasti Unnayan) নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা এনজিও রয়েছে। এই সংস্থার মাধ্যমেই পুরসভা হাসপাতালে ওই আট জনের নাম পাঠিয়েছিল।সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ওই আট জন অনুমোদিত কর্মীর বেতন বাবদ মাথাপিছু ১১,৩৬৩ টাকা করে বরাদ্দ করা হত। এর সঙ্গে আরও অতিরিক্ত ২,৫০০ টাকা দেওয়া হত।
সব মিলিয়ে ওই আট জনের বিল হিসেবে হাসপাতাল থেকে মোট ৯৩,৪০৪ টাকা তুলে নিত ওই এনজিও।কিন্তু এখানেই ঘটে আসল বিপত্তি। পুরসভা ওই আট জনের পাশাপাশি আরও ১২ জনকে, অর্থাৎ মোট ২০ জনকে হাসপাতালে কাজের জন্য পাঠাত। এই অতিরিক্ত ১২ জনের কোনও সরকারি অনুমোদন ছিল না। আর বেতন?
সরকারের দেওয়া ওই আট জনের টাকাটাই ২০ জনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিত পুরসভা! এর ফলে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে প্রতিদিন ৬ ঘণ্টা করে ডিউটি করার পরেও এই কর্মীরা মাস শেষে হাতে পেতেন মাত্র ৪,৪৭০ টাকা। এই সামান্য টাকাতেই তাঁরা এতদিন সংসার চালিয়ে আসছিলেন।


Recent Comments