স্থলে জলে বনতলে... নিউজস্কোপ-এর নিবেদন
কমল সেনগুপ্ত, বরিশাল
হাওয়ায় কেমন এক অস্থিরতা। ‘রাঙা হাসি রাশি রাশি অশোক পলাশে, রাঙা নেশা মেঘে মেশা প্রভাত-আকাশে’। শিমুল গাছ লাল পাঁপড়ি বিছিয়ে পথ রাঙিয়ে দিয়েছে, পলাশ যেন আগুন জ্বেলে বলছে—’এসো, রঙে ভেসে যাক সব অভিমান!’ হৃদয় বলছে, বসন্ত এসে গেছে। বসন্ত মানে দোল। মন বলছে, দোল আসছে নিঃশব্দে।
দোল মানেই দাদু-ঠাকুমার সাথে গ্রামের বাড়ি ফুল্লশ্রী যাওয়া। ‘পশ্চিমে ঘাঘর নদী পূর্বে ঘণ্টেশ্বর, মধ্যে ফুল্লশ্রী গ্রাম পণ্ডিত নগর’, মনসামঙ্গলের কবি বিজয়গুপ্তের সেই মানসী ফুল্লশ্রী। আমার পৈত্রিক ভিটা। বরিশাল থেকে বাসে চড়ে গৌরনদী, সেখান থেকে রিকশায় ফুল্লশ্রী, গ্রামের পথে পথে আবেগ আর অনুভূতি।
সেকালে গৌরনদী নেমে রিকশায় আগৈলঝাড়া, এরপর মাটির পথ ধরে পায়ে হেঁটে, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি হয়ে, বাড়িতে বাড়িতে হাসি, সে আরেক উল্লাস! ফাল্গুনী পূর্ণিমার শুক্লা চতুর্দশী তিথিতে দোল উৎসব। আগের দিন সন্ধ্যায় অধিবাস। অধিবাসে খড়কুটো দিয়ে তৈরী ‘বুড়ির ঘর’ পোড়ানো। মন্দিরে কীর্তন সহকারে সামনে একটি কদম গাছের চারপাশ প্রদক্ষিণ করে, কদম গাছের আগায় ‘লাল পতাকা’ উড়ানো হত। একাজটি করতেন ফুল্লশ্রী নিবাসী দেবানন্দ দাস। সত্তরোর্ধ্ব দেবানন্দ জানান, ‘ হিন্দুরা বিশ্বাস করে কদম গাছ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের খুব প্রিয়। শৈশবে, তিনি কদম গাছে বসে বাঁশি বাজাতেন। তিনি জানান, ‘গ্রামের এক প্রবীণ শিক্ষক বলেছিলেন, তিনি এই কদম গাছে নিচে দাঁড়িয়ে বাঁশির সুর শুনেছেন’।
দোলের ভোর, সকাল থেকেই শুরু হত কীর্তন, হারমোনিয়ামের সুরে খোল, কর্তাল, কাঁসর ঘন্টার বাজনায় কি যে এক মোহনীয় পরিবেশ, তা শুধু স্মৃতিতেই অনুভূত হয়, কম্পিউটারের কিবোর্ডের ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ধবধবে সাদা ধুতি পরে দাদু পূজায় বসতেন।
সেকালে হিন্দু বাড়িতে দোলের অনুষ্ঠান হত। কিন্তু বেলা বাড়তেই সবাই হাজির হত এই মন্দিরে। পদ্ম, আমি, শৈলেশ,আমার ছোট ভাই শ্যামল সহ সাথিরা হাজির। মন্দিরে পিতলের থালায় গোলাপি আবির, সবার মুঠোয় কাগজে মোড়ানো আবির, কারও হাতে বাঁশের তৈরি ‘পিচকারি’। বড়রা বাঁশ দিয়ে ‘পিচকারি’ তৈরি করে দিত।
বিশিষ্ট সাংবাদিক শ্রদ্ধেয় অশোক সেনগুপ্তের নির্দেশ আর উৎসাহে যখন স্মৃতিকথা লিখতে বসছি, তখন মনে হয়, সময় নিজেই আমাকে রাঙিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে, স্মৃতির রঙে, ভালোবাসার রঙে। শৈশব স্মৃতির সেই উঠোনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে কত স্মৃতি। ধোয়া জামা পড়ে কীর্তন শুনতে এসেছে পাশের পাড়ার সমীর, বন্ধুরা ছুটে এসে গালে মেখে দেয় রঙ, কেউ বলে ’ধরেছি তোকে!’
সেকালের সাথি সুব্রত দাশগুপ্ত পদ্ম, এখন ওপার বাঙলার যাদবপুর-সন্তোষপুরে। কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন পুরপ্রতিনিধি (কাউন্সিলর), পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সুন্দরবন বিষয়ক দফতরের ভূতপূর্ব মন্ত্রীর আপ্ত -সহায়ক (কনফিডেন্সিয়াল এসিস্ট্যান্ট) ছিলেন। শৈশবে ফুল্লশ্রীর দোল উৎসব আর রঙখেলা নিয়ে অনেক স্মৃতি আছে তাঁর। পাশাপাশি বাড়ি ছিল।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, কত কথা মনে পড়ছে, আমরা জলে আবির মিশিয়ে রঙ দিতাম। দোলে তোমরা আসতে বরিশাল থেকে, এছাড়া গ্রামবাসী মিলেমিশে দোল ছিল আবেগের মিলনোৎসব।’ কথা হল ফুল্লশ্রীর শৈলেশের সাথে, শৈশবের স্মৃতিচারণে মিলেমিশে গেল এপার-ওপার।
দোলের দিন, ফুল্লশ্রীর রাঙামাটির পথ ধরে আমরা ছুটে বেড়াতাম, এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি, আনন্দ আর উল্লাসে। দুপুর গড়ালে রঙের উন্মাদনা আরও যেন ঘন হতো। মুখ দেখে চেনা যেত না, সবাই আবির রঙে একাকার। স্নান করতে পুকুরে নেমেও দাপাদাপি, শরীরের আবির ধুয়ে জল তখন হালকা গোলাপি। মনে হতো পুকুরের জলও দোল খেলছে।
স্নান শেষেও চুলে রঙের গন্ধ, জামায় আবিরের ছাপ। মা রেগে বলত ‘এই দিকে আয়’, গামছা দিয়ে মাথা মুছিয়ে দিতে দিতে বলত, ‘বারবার মানা করছি, নতুন জাগায় আইছো, পুকুরে ডুবাইছো, দেহিস রাত্রে জ্বর হইবে’। তখন ফুল্লশ্রীতে বিদ্যুৎ ছিল না। সারাদিন কীর্তন, সন্ধ্যায় হ্যাজাক লাইট জ্বলিয়ে, কীর্তন সহকারে গ্রাম প্রদক্ষিণ। ধানের ক্ষেতের ‘আইল’ ধরে সোজা পূবে। আহা কি আনন্দ! কি আবেগ!
জেলা সমাজ সেবা অফিসার, সাংস্কৃতিক সংগঠক শ্যামল সেনগুপ্ত জানায়, ‘রাতে উঠোনে হ্যাজাক লাইটের আলোতে কলাপাতায় ভোগের খিচুরি আর মিষ্টান্ন খাওয়ার দৃশ্য খুব মনে পড়ে, দাদা’। আশি উর্ধ্ব বৃদ্ধ পরেশ চন্দ্র তপাদার জানায়, ফুল্লশ্রীর দোল উৎসব শতাধিক বছরের পুরনো। এককালে শ্রীশ্রীবিজয়ানন্দ স্বামীর নির্দেশে তাঁর শিষ্যরা ফুল্লশ্রীর আশ্রমে দোল উৎসবের সূচনা করে। তখন ঠাকুরের দুই-তিন শত শিষ্য আসত, দোল উৎসবে। সেদিন এখন অতীত। গ্রামবাসীরা এখন তাঁর স্মৃতি ধরে রেখেছি মাত্র’।
দোলযাত্রা বাঙ্গালি হিন্দুদের অন্যতম প্রধান উৎসব, যা বসন্ত বা রঙের উৎসব নামেও পরিচিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে নারায়ণগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও থেকে গোপালগঞ্জ বাংলাদেশের ৬৪ জেলায়ই দোলের এ রকম স্মৃতি আছে। পথে পথে রঙখেলা আছে। মাঠে ঘাটে কদম গাছ আছে, শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির সুর আছে। বাংলাদেশে দোল উৎসবের মূল আয়োজন হয় ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে। ভজন কীর্তন, আবির খেলা ও হোমযজ্ঞ শেষে থাকে প্রসাদ বিতরণ।
এছাড়া রামকৃষ্ণ মিশন, ইসকন মন্দিরসহ বিভিন্ন মন্দিরে এ উৎসব পালিত হয়। বরিশাল নগরীর শ্রী শ্রী শংকর মঠেই হয় দোল উৎসবের বড় আয়োজনটি। বাংলাদেশে দোল উৎসবের ধরন পাল্টেছে, বাড়িতে তৈরি আবিরের বদলে কেমিক্যাল রং ও পাকা রঙের ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের তালে কীর্তনের বদলে কর্ণভেদী শব্দধ্বনিতে বিদেশী সংস্কৃতির প্রচারই এ কালের দোল। দোলের শুভেচ্ছা বিনিময় বেশি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।






রঙের উৎসব সেই দোল আর নেই। ফুল্লশ্রীও বদলে গেছে। পিচকারির রঙিন জল এখন স্মৃতিতে। উঠোনে কোলাহলও নেই। কিন্তু সেই শৈশব আজও ডাকে, ডাকে দোল, ইচ্ছে হয় আবির রঙে রাঙাতে। বসন্ত বাতাসে চোখ বন্ধ করলেই মনে হয় কেউ যেন ডাকছে, ‘ও-ও -ও আয় রে ছুটে আয়!’ কিন্তু সাথিরা কোথায়? পদ্ম দেশান্তরী, অন্যরা কোথায় হারিয়ে গেছে যে…।
শুধু শৈলেশ আছে ফুল্লশ্রীতে, দোলের রঙে, স্মৃতির পাহারায়। পদ্ম! এবার দোলে আসবে? রঙে রঙে রাঙিয়ে দিতে, ‘তোমার তরুণ হাসির অরুণ রাগে, অশ্রুজলের করুণ রাগে।’ শুধু একবার জানাও—আমি বরিশালের বুক চিরে পথ ধরব রঙের আহ্বানে, স্মৃতির হাত ধরে, হৃদয়ের সব অপেক্ষা সঙ্গে নিয়ে ঠিক রওনা হব।

