সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু (President Droupadi Murmu) -র বাংলা (Bengal) সফর ঘিরে তৈরি হয়েছে এক অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক বিতর্ক। এই হাই-প্রোফাইল সফরের সময় প্রোটোকল লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আর সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই এবার কড়া পদক্ষেপ করল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। কেন্দ্রীয় সরকারের কড়া সুপারিশ মেনে শেষ পর্যন্ত দার্জিলিং (Darjeeling) -এর জেলাশাসক মণিশ মিশ্র (Manish Mishra) এবং শিলিগুড়ি (Siliguri) -র পুলিশ কমিশনার সি সুধাকর (C Sudhakar) -এর বিরুদ্ধে বড়সড় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই নবান্ন (Nabanna) পদক্ষেপ গ্রহণ করে দার্জিলিংয়ের জেলাশাসককে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
জানা গিয়েছে, ওই দুই শীর্ষ আধিকারিককে বর্তমান দায়িত্ব থেকে সরিয়ে কেন্দ্রীয় ডেপুটেশনে পাঠানোর জন্য সুপারিশ করেছিল অমিত শাহের মন্ত্রক। এই নির্দেশের পরেই দার্জিলিংয়ের নতুন জেলাশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন সুনীল আগরওয়াল (Sunil Agarwal)। অন্যদিকে, মণিশ মিশ্রকে স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের বিশেষ সচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। প্রশাসনিক মহলে এই রদবদল নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে, কারণ আসন্ন নির্বাচনের ঠিক আগে প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে এই ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
*বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক সবিনয় প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন ক্ষুব্ধ রাষ্ট্রপতি নিজে। *ঘটনার দিন এবং পরদিন কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। *মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যেই দাবি করেছিলেন রাষ্ট্রপতির প্রতি কোনও অবমাননা হয়নি। *বিজেপি-র রাজ্য ও কেন্দ্রীয় স্তরের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সমালোচনায় মুখর হন। *প্রশ্ন ওঠে কেন্দ্রের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্কের ক্রম-অবনতি নিয়ে।
এই ঘটনার গভীরে গিয়ে দেখা যায়, মূল সূত্রপাত গত ৭ মার্চ। আন্তর্জাতিক আদিবাসী ও সাঁওতাল কাউন্সিলের নবম সম্মেলনে যোগ দিতে শিলিগুড়িতে এসেছিলেন রাষ্ট্রপতি। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল, সম্মেলনটি শিলিগুড়ি সংলগ্ন আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা ফাঁসিদেওয়া (Phansidewa) ব্লকের বিধাননগর (Bidhannagar) -এর সন্তোষিনী স্কুল ময়দানে অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানস্থল পরিবর্তন করে বাগডোগরা (Bagdogra) সংলগ্ন গোঁসাইপুর (Gosaipur) -এ নিয়ে যাওয়া হয়। এই হঠাৎ স্থান পরিবর্তন নিয়েই শুরু হয় যাবতীয় বিপত্তি।
গোঁসাইপুরের মঞ্চ থেকে প্রকাশ্যেই নিজের ক্ষোভ উগরে দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সুরে জানান যে, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত ভালো, মুখ্যমন্ত্রীকে তিনি নিজের বোনের মতো দেখেন। তা সত্ত্বেও, তাঁকে এই রাজ্যে সহজে আসতে দেওয়া হয় না। এরপর তিনি বিধাননগরে গিয়েও অনুষ্ঠানস্থল পরিবর্তনের কারণে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এই ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই রাজ্য রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, রাজ্য প্রশাসনের গাফিলতিতেই এমনটা হয়েছে। অন্যদিকে রাজ্য সরকার পাল্টা দাবি করে, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাই এই স্থান পরিবর্তনের একক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, রাজ্যের এতে কোনো হাত ছিল না।
পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয় যখন কেন্দ্র এই গোটা বিষয়ে রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করে। কিন্তু রাজ্যের পাঠানো সেই রিপোর্টে একেবারেই সন্তুষ্ট হয়নি কেন্দ্র। আর তার ফলেই ওই দুই আধিকারিককে ডেপুটেশনে ডেকে পাঠায় দিল্লি। এই ঘটনা রাজ্যের শাসকদলের অস্বস্তি যে অনেকটাই বাড়িয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব (Gautam Deb) জানিয়েছেন, এই ঘটনার পেছনের মূল উদ্দেশ্য সাধারণ মানুষের কাছে কাঁচের মতো পরিষ্কার। অন্যদিকে, বিজেপি বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ (Shankar Ghosh) কড়া ভাষায় সমালোচনা করে বলেন, এটি সরাসরি দেশের এবং রাষ্ট্রপতির অপমান, তাই কেন্দ্রের এই কড়া পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ছিল।
এই ঘটনা অনেককেই স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিচ্ছে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় (Alapan Bandyopadhyay) -এর কথা। ২০২১ সালের নির্বাচনের পর ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের সময় প্রধানমন্ত্রীর পর্যালোচনা বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বেরিয়ে যাওয়া নিয়ে ঠিক এভাবেই কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে তীব্র সংঘাত তৈরি হয়েছিল। সেবারও কেন্দ্র কড়া ব্যবস্থা নিয়েছিল, যা নিয়ে দীর্ঘ আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই চলে। বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সেই মনস্তাত্ত্বিক সংঘাতের আগুন আজও পুরোপুরি নেভেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের আমলাতান্ত্রিক রদবদল শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াই। সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন জাগছে, প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে এমন টানাপোড়েন চললে রাজ্যের উন্নয়নমূলক কাজ কতটা মসৃণভাবে এগোতে পারবে? সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতির এই সফর শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক সফর হিসেবে সীমাবদ্ধ রইল না, বরং তা জন্ম দিল এক নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে রাজ্যের আগামী রাজনৈতিক সমীকরণে।

Recent Comments