অশোক সেনগুপ্ত
ক্ষমতায় নেই দল। জয় আসবে কি না, তা নিয়েও ধন্দ! সংগঠনও নেই। তা সত্বেও প্রত্যাখ্যাত প্রত্যাশীদের ক্ষোভের আঁচে ঘুম উড়েছে পদ্ম-কর্তাদের।
অমিত শাহ তাঁর ‘গুণগ্রাহী’ বলেও শোনা যায়। তাই বার বার নানা কঠিনতর দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই চাপে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজেপি তার সুফলও পায়। এ হেন সুনীল বনসল পশ্চিমবঙ্গে এসে ঈষৎ ‘কথার খেলাপ’ করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে বিজেপির অন্দরমহলে।
ভোটের আগে অন্তত মাস ছয়েক ধরে যাঁদের কাজে লাগিয়ে রাজ্য জুড়ে সংগঠন গুছিয়ে নিচ্ছিলেন বনসল, তাঁদের কয়েক জনকে ভোটে টিকিট দেওয়ার ‘কথা’ ছিল তাঁর। কিন্তু প্রার্থীর নামতালিকায় বিজেপি ঘোষণা করেছে, তাতে সে প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট মহলে তৈরি হয়েছে ‘অভিমান’।
প্রথমে ক্ষোভ ছিল জেলা স্তরে। ক্রমে তার আঁচ এসে পড়েছে সল্টলেকে বিজেপির সদর দপ্তরে। প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বিজেপির নেতা, কর্মীরা। প্রার্থী বদলের দাবিতে সল্টলেকে বিজেপির অফিসেই বিক্ষোভ দেখিয়েছেন তাঁরা।
কোনও প্রার্থী দলটাই করেননি কোনওদিন, আবার কোনও প্রার্থী এলাকায় গ্রহণযোগ্য নয়— এ রকম নানা অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন কর্মী, সমর্থকেরা। ভোটের টিকিট না-পেয়ে ক্ষুব্ধ দিলীপ–জায়া রিঙ্কু। তিনিও সল্ট লেকের বিজেপি দফতরে হাজির।
বিধানসভা নির্বাচনে রাজারহাট-নিউটাউন আসনে প্রার্থী হতে চেয়ে বিজেপি নেতৃত্বের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন রিঙ্কু। জমা দিয়েছিলেন নিজের জীবনপঞ্জী! দলের দ্বিতীয় প্রার্থীতালিকায় ওই আসনে অন্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা হতেই প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেন রিঙ্কু। আর সেই সঙ্গে নাম না করে টেনে আনেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং ব্যারাকপুরের প্রাক্তন সাংসদ অর্জুন সিংহের পরিবারকে।
রিঙ্কু জানিয়েছেন, নিজের ক্ষোভের কথা বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে রাজারহাট-নিউটাউনের বিজেপি প্রার্থী পীযূষ কানোরিয়ার নাম না করে বলেন, ‘‘যাঁকে প্রার্থী করা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে।’’ শুক্রবার বিধাননগরে বিজেপির দফতরে এসে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সুনীল বনসলের সঙ্গে দেখা করেন রিঙ্কু। বৈঠকের পরে তিনি বলেন, ‘‘আমাকে টিকিট না দেওয়া উচিত হয়নি। আমি দিলীপ ঘোষের আগে থেকে বিজেপি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।’’
এ বারের বিধানসভা ভোটে প্রাক্তন বিধায়ক দিলীপকে তাঁর পুরনো কেন্দ্র খড়্গপুরে প্রার্থী করা হলেও বাদ পড়েছেন রিঙ্কু। যে হেতু সাংগঠনিক প্রথা মেনে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রার্থিতালিকা চূড়ান্ত করেন, তাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছেই তিনি ক্ষোভ জানিয়ে এসেছেন বলে দাবি দিলীপ-জায়ার। রিঙ্কু বলেন, ‘‘আমাকে নেতৃত্ব বলেছেন দাদাকে (দিলীপ) জেতাতে। আমি বলেছি, ‘দাদাকে জেতানোর জন্য আমাকে প্রয়োজন নেই। বিজেপি কর্মীরাই যথেষ্ট। তবে আমি খড়্গপুরে যাব’।’’
সামাজিক মাধ্যমে তাঁর ক্ষোভপ্রকাশে নানা প্রতিক্রিয়া এসেছে। এ নিয়ে একটি ডিজিটাল মাধ্যমের খবরে শনিবার বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত সহস্রাধিক প্রতিক্রিয়া এসেছে। প্রায় সবই ব্যাঙ্গাত্মক। হোয়াটসঅ্যাপে বড় হরফে ডঃ কল্যাণকুমার ভট্টাচার্য লিখেছেন, “রিঙ্কু বলেছে রাজনীতি ছেড়ে দেবে। আরম্ভ করলেন কবে? বিয়ের আগে তো তৃণমূল ছিলেন। তৃণমূল তো ক্লাব। সেক্রেটারি মমতা। উনি রাজনীতি ছাড়লে কিন্তু রাজ্যের ভীষণ ক্ষতি হবে।”
বিজেপি ভগবানগোলা ফেসবুক গ্রুপে ২০ মার্চের একটি পোস্টে দেখা যাচ্ছে— ‘প্রার্থী পরিবর্তন চাই’, ‘দালাল চটিচাটা’ বড় অক্ষরে ছবি-সহ। এই সঙ্গে লেখা— “এখন পর্যন্ত দেখা নেই। বিজেপি-র সিম্বল পাওয়ার যোগ্য নয়
আমাদের কর্মীদের ভরসা ভেঙে দিয়েছে এই সৌমেন মন্ডল আমাদের কর্মীদের বসিয়ে দিয়েছে। নিজেদের পারিবরিক ব্যক্তিগত স্বার্থ, প্রার্থী নাম ঘোষণা হওয়ার পর আজ পর্যন্ত কোনো মন্ডল বা গ্রাম কর্মসূচী করেনি। করবে কোথা থেকে? টাকাটা ঢুকলে তো করবে! দাবি একটাই প্রার্থী চেঞ্জ করুন , দালালদের কথায় দল চলে না।”
হাওড়ার বালি বিধানসভায় বিজেপির ‘বহিরাগত প্রার্থী’- প্রসঙ্গে শুক্রবার সন্ধ্যায় বিক্ষোভ দেখান ক্ষুব্ধ বিজেপি কর্মীরা। প্রার্থীকে ঘিরে ‘দূর হঠও’ স্লোগান ওঠে।পদত্যাগ করেন সত্তর জন বুথ সভাপতি। বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আসে প্রকাশ্যে। বালি কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী করা হয়েছে সঞ্জয় সিংকে। এনিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন বালি কেন্দ্রের বিজেপি কর্মীদের একাংশ। বেলুড় লালমোহন মুখার্জি স্ট্রিটে নির্বাচন সংক্রান্ত বৈঠক চলাকালীন ক্ষুব্ধ কর্মীরা পার্টি অফিসে ঢুকে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। সেই সময় উপস্থিত ছিলেন প্রার্থী সঞ্জয় সিং।দু’পক্ষের স্লোগান পাল্টা স্লোগান চলতে থাকে। উত্তেজনা ছড়ায়। বিক্ষুব্ধদের বক্তব্য, বহিরাগত সঞ্জয় সিংকে তাঁরা মানবেন না। বহিরাগত দূর হঠ স্লোগান দিতে থাকেন। অস্বস্তিতে পড়ে যান প্রার্থী। বিক্ষুব্ধ বিজেপি নেতা ইন্দ্রনীল দাশগুপ্ত ও অনুগামীদের দাবি, এখানে বালির ভূমিপুত্র চাই। যাঁকে বিপদে আপদে পাওয়া যাবে।
প্রাক্তন সভাপতি এবং প্রাক্তন সম্পাদক, মহিলা মোর্চা দক্ষিণ কলকাতা জেলা, বিজেপি
মিতালী সাহা এবার বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে দলের প্রার্থীর বিশেষ দায়িত্বে আছিেন। তাঁর মতে, সিদ্ধান্ত নেয় আমরা তার বিরোধ করি না – আমাদের বিচার ধারার এটাই শিক্ষা।
আমি এই মুহূর্তে বালিগঞ্জের প্রার্থীকে নিয়ে খুব খুশী। লড়াই হবে। অন্যবারের মত টিএমসি-র ওয়াক ওভার হবে না।”
প্রার্থীবাছাই নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষুব্ধ অনেকে নানা মন্তব্য করেছেন। অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রার্থীঘোষণার প্রাথমিক তালিকায় বাংলার বদলে কেবল ইংরেজি-হিন্দি লেখায়। তাঁদের বক্তব্য এবং স্পষ্ট অভিযোগ, বিজেপি কি কোনওদিন বাঙালির দল হতে পারবে না? অসংখ্য অভিযোগ ও আক্ষেপ আসে এ নিয়ে। পরে অবশ্য দলের তরফে বাংলায় প্রার্থী তালিকা প্রচার করা হয়।


Recent Comments