স্থলে জলে বনতলে... নিউজস্কোপ-এর নিবেদন
শহুরে যান্ত্রিকতার ধূসর আকাশ সরিয়ে প্রকৃতি যখন লালে লাল হয়ে ওঠে, তখনই বোঝা যায় শান্তিনিকেতনে বসন্ত এসে গেছে। রবীন্দ্রনাথের সেই অমর বাণী— “রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও যাও গো এবার যাওয়ার আগে”— এই সুরই যেন এখন ছাতিমতলা থেকে উত্তরায়ণ, প্রতিটি প্রান্তে অনুরণিত হচ্ছে। শান্তিনিকেতনের বসন্তোৎসব কেবল একটি উৎসব নয়, এ হলো প্রকৃতি ও প্রাণের এক গভীর মিতালি।
রঙের শোভাযাত্রা ও আশ্রম প্রাঙ্গণ
ভোরের কুয়াশা কাটতে না কাটতেই শান্তিনিকেতনের আকাশ বাতাস আবিরের রঙে রঙিন হতে শুরু করে। ছাত্রছাত্রীদের পরনে হলুদ বসন, গলায় বসন্তের গান আর খোঁপায় পলাশের সমারোহ— এ যেন এক স্বর্গীয় দৃশ্য। প্রথা মেনে সকালে বৈতালিকের মাধ্যমেই শুরু হয় দিনটি। আম্রকুঞ্জের ছায়ায় যখন ছাত্রছাত্রীদের নাচের ছন্দে ধুলো ওড়ে, তখন সেই ধুলোও যেন আবিরের মতো রঙিন মনে হয়। এবারের বসন্তোৎসবে আভিজাত্য ও আধুনিকতার এক অপূর্ব মিশেল লক্ষ্য করা গেছে।
অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা
শান্তিনিকেতনের এই আনন্দধারায় কোনো ভেদাভেদ নেই। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উৎসবে মেতেছেন অধ্যাপকরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রবীণ অধ্যাপকের কথায়, “শান্তিনিকেতনের বসন্ত মানে শুধুই হুল্লোড় নয়, এটি হলো অন্তরের কলুষতা ধুয়ে মুছে নিজেকে শুদ্ধ করার উৎসব।” শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে ছিল উপচে পড়া উচ্ছ্বাস। এক ছাত্রীর কথায়, “সারা বছর আমরা এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করি। এখানে রঙ খেলা মানে একে অপরের হৃদয়ের কাছাকাছি আসা।”
পর্যটকদের চোখে শান্তিনিকেতন
দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটকের ভিড়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। তবুও নেই কোনো বিশৃঙ্খলা। পর্যটকদের মতে, শান্তিনিকেতনের মনোরম পরিবেশ আর এখানকার মানুষের সহজ-সরল আপ্যায়ন তাদের বারবার ফিরে আসতে বাধ্য করে। জার্মানি থেকে আসা এক পর্যটক দম্পতি জানালেন, “শান্তিনিকেতনের দোলের একটা নিজস্ব ছন্দ আছে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া দায়।” বিকেলের দিকে যখন বাউল গানের সুর ওঠে, তখন সেই সুর পর্যটকদের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেয়।
প্রকৃতির কোলে প্রাণের স্পন্দন
শান্তিনিকেতনের রাঙা মাটি আর পলাশের লাল রঙ যখন মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, তখন মনে হয় বসন্ত বুঝি এখানেই তার ঘর বেঁধেছে। কৃত্রিম রঙের বদলে ভেষজ আবিরের ব্যবহার উৎসবের নান্দনিকতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। দিনভর গান, নাচ আর আবির খেলার পর শান্ত গোধূলিতে যখন ক্লান্ত রোদ শান্তিনিকেতনের মাঠে এসে পড়ে, তখন চারদিকে এক মায়াবী নিস্তব্ধতা বিরাজ করে।
শান্তিনিকেতনের বসন্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবন মানেই আনন্দ আর সম্প্রীতি। পলাশ রাঙা এই দিনগুলো যেন সারা বছরের জন্য নতুন প্রাণশক্তি সঞ্চার করে দিয়ে যায় সবার মনে।

