স্থলে জলে বনতলে... নিউজস্কোপ-এর নিবেদন
মৌসুমী সেনগুপ্ত
রাধা-কৃষ্ণ রঙের আবিরে প্রেমলীলা উদযাপন করেছিলেন। সেই ঐতিহ্য মেনেই দোলের সকালে ঠাকুরের পায়ে আবির ছুঁইয়ে শুরু হয় দোল উৎসব।
বৈষ্ণব বিশ্বাস অনুযায়ী, দোল পূর্ণিমার দিন বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণ আবির নিয়ে রাধিকা ও অন্যান্য গোপীনীদের সঙ্গে রঙ খেলায় মেতেছিলেন। অন্যদিকে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্ত উৎসব চালু করেছিলেন। তাই রঙিন এই উৎসবের দিকে মুখিয়ে থাকে অনেকেই।
প্রতি বছরের মতো দোল উৎসব ঘিরে প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে, তখনই এখানে ওখানে বিক্রি হতে হয় নানা রঙের আবির। একসময় আবিরের প্রায় পুরোটাই ছিল রাসায়নিক জিনিস মেশানো। তাতে শরীরের ক্ষতি হত। গত ক’বছরের লেখালেখিতে সচেতনতা বেড়েছে। বাজারে বেড়েছে ভেষজ আবিরের চাহিদা।
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কল্লোল পাল ডানিয়েছেন, “প্রকৃতির বিবিধ বৈচিত্র্যের মতোই আবিরের (Abir) বিভিন্ন রং-এও রয়েছে সেই বৈচিত্র্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় রাসায়নিক মুক্ত ভেষজ আবির তৈরি করেছে এবং সেই ‘কল্যাণবর্ণ’ দিয়েই সকলে মেতেছে বসন্ত উৎসবে, এটা অত্যন্ত গর্বের বিষয়।’
পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুকে আবিরের বিভিধ্ন কারখানায় গত কদিন ধরে ছিল তুমুল ব্যস্ততা।
তমলুকের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে উত্তরচড়া শংকর এলাকায় প্রায় তিন দশক ধরে তৈরি হয় বিপুল পরিমাণ ভেষজ আবির। সেখানে একটি কারখানায় ১০ রঙের ভেষজ আবির তৈরি হয়। চাহিদা কতটা?
এরকমই একটি প্রস্তুতকারক সংস্থার ম্যানেজার চন্দন কুমার জানান, চার জন কর্মী মিলে প্রতিদিন সাড়ে সাত কুইন্টাল ভেষজ আবির তৈরি হয়। কাজ শুরু হয় দোলের তিন মাস আগে থেকেই। পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা আয়ুষ দফতরের আধিকারিক প্রকাশ হাজরাও ভেষজ আবির ব্যবহারে সচেতনতা বাড়ার কথা স্বীকার করেছেন।
ব্যস্ততা দক্ষিণ ২৪ পরগনার মন্দিরবাজারের বিভিন্ন আবির কারখানায়। প্রতি বছরের মতো এবারও উৎসবের আগে সেখানে উৎপাদন ছিল তুঙ্গে। মন্দিরবাজারের আবির শুধু দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেই সীমাবদ্ধ নেই। কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা-সহ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন আবির কিনতে। কাকদ্বীপ, নামখানা, ডায়মন্ড হারবার, ক্যানিং, পাথরপ্রতিমা, বজবজ-সহ একাধিক এলাকায় এখানকার আবির সরবরাহ করা হয়। জেলার মধ্যে এই আবিরের আলাদা সুনাম রয়েছে বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও। চাহিদা সামাল দিতে স্থানীয় শ্রমিকদের পাশাপাশি ভিনরাজ্য থেকেও কারিগর-শ্রমিক আনা হয়েছে।
অ্যারারুটের সঙ্গে প্রাকৃতিক রঙ মিশিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ফুটিয়ে তা শুকনো করা হয়। পরে রোদে ভালোভাবে শুকিয়ে, চালুনিতে ছেঁকে মোড়কবন্দি করা হয়। সকাল হতেই বিভিন্ন কারখানায় শুরু হয়ে গিয়েছে কাজ। ক’দিন ধরে গভীর রাত পর্যন্ত চলেছে রং মেশানো, শুকোনো, ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নেওয়া এবং প্যাকেটজাত করার প্রক্রিয়া। নাওয়া-খাওয়া ভুলে কারিগররা দিনরাত এক করে আবির তৈরির কাজ করেছেন। কারখানার ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে রঙের বাহার৷ টকটকে লাল, উজ্জ্বল হলুদ, সবুজ, নীল, গোলাপি, কমলা, বেগুনি ও সাদা-মোট আট ধরনের আবির তৈরি হয়ছে এখানে।
কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ভেষজ আবির এখন তৈরি হচ্ছে নানা জায়গায়। রাসায়নিক দিক থেকে ক্ষতিকারক আবিরের কুফল সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে রবিবার (১ মার্চ) বসিরহাটে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের দীনেশ মজুমদার কেন্দ্র একটি কর্মশালার আয়োজন করে। সেখানে পড়ুয়াদের শেখানো হয় কিভাবে ফুল গাজর শাকসব্জি-সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে আবির তৈরি করতে হয়। নিজেরাই ভেষজ রঙ তৈরির সুযোগ পেয়ে খুব খুশি পড়ুয়ারা। বইয়ের পাতার বাইরেও যে বিজ্ঞান আছে, তা অনুভব করে শিবিরের শিক্ষার্থীরা।
ভেষজ আবির তৈরির এরকমই একটি শিবির সদ্য বসেছিল হুগলির খানাকুলের রামনগর অতুল উচ্চ বিদ্যালয়। ‘সবুজ পৃথিবী, সুস্থ ভবিষ্যৎ’— এই অঙ্গীকার সামনে রেখে স্কুলের তরফে ওই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কেবল তৈরি করাই নয়, সেই ভেষজ আবির স্কুলের পড়ুয়াদের বিলি করা হয়। নিমপাতা, গাঁদা ও গোলাপ ফুলের পাপড়ি, বিট, গাজর, পালং প্রভৃতি দিয়ে তৈরি করা হয় ওই ভেষজ আবির। মূল উদ্যোক্তা ছিল বিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ।
এভাবেই, কোথাও রাসায়নিক মেশানো আবির, কোথাও ভেষজ আবির তৈরির মধ্যে
বেশ কিছুকাল ধরে ব্যস্ত ছিলেন অনেকে। সেই ব্যস্ততায় আপাতত একটা বড় ছুটি। দোলের পর আবার আবিরের চাহিদা বাড়বে রাজনীতির অঙ্গণে। জয়ী প্রার্থীদের মাতোয়ারা হওয়র জন্য।

