স্থলে জলে বনতলে... নিউজস্কোপ-এর নিবেদন
অশোক সেনগুপ্ত
“বসন্তকালের সেই মালীদের ফুলের ঝুড়ির খবর নেই, কেন জানি নে। তখন বাড়িতে
মেয়েদের খোঁপা থেকে বেলফুলের গােড়ে মালার গন্ধ ছড়িয়ে যেত বাতাসে। গা ধুতে
যাবার আগে ঘরের সামনে বসে সমুখে হাত-আয়না রেখে মেয়েরা চুল বাঁধত। বিনুনি-করা
চুলের দড়ি দিয়ে খোঁপা তৈরি হত নানা কারিগরিতে। তাদের পরনে ছিল ফরাসডাঙার
কালাপেড়ে শাড়ি, পাক দিয়ে কুঁচকিয়ে তোলা। নাপিতনি আসত, ঝামা দিয়ে পা ঘসে
আলতা পরাত। মেয়েমহলে তারাই লাগত খবর-চালাচালির কাজে।”
দোল মানে বসন্তকাল। শৈশবে বসন্তকালে ঘরের এ রকম অনুভূতির কথা লিখে গিয়েছেন অনেকে। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে দোলযাত্রা বা হোলি অন্যতম। বসন্ত এসেছিল কবি জীবনানন্দ দাশের ভাবনাতেও।
“ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে—
বসন্তের রাতে
বিছানায় শুয়ে আছি;
—এখন সে কতো রাত!” পরে তিনি লিখেছেন— “শরীরে এসেছে স্বাদ বসন্তের রাতে,
চোখ আর চায় না ঘুমাতে;”। ‘পাখিরা’ কবিতায় সেই জীবনানন্দই লিখেছেন—
“আজ এই বসন্তের রাতে
ঘুমে চোখ চায় না জড়াতে;
ওই দিকে শোনা যায় সমুদ্রের স্বর,
স্কাইলাইট মাথার উপর,
আকাশে পাখিরা কথা কয় পরস্পর।”
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় দোল, আবীর—এসবের উল্লেখ কতটা আছে, জানি না। আমির খসরু গেয়েছেন ‘আপনি সি রং দিনি রে মোসে নয়না মিলাইকে’? তবে সবাইকে বসন্ত বলুন, বা দোলের কব্যগীতিতে টেক্কা দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বসন্তের আগমনে কবি উচ্ছ্বসিত হয়েছেন, যা তাঁর ‘দক্ষিণ দুয়ার খুলি’ বা ‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়’ গানগুলোতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব কবিগুরুর প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা পরবর্তীকালে ঐতিহ্যে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ কখনও বসন্তকে প্রথম ফাল্গুনের মত্ত কৌতূহলী, কখনও বা পীতাম্বর পরিহিত রূপক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছে বসন্ত কেবল ঋতুরাজই নয়, বরং তা মানব মন ও প্রকৃতির পুনর্জাগরণের প্রতীক।
আধুনিক কবিদের মধ্যে দুর্বোধ্যতার অভিযােগে সর্বাপেক্ষা বেশী অভিযুক্ত যিনি, তার নাম বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২)। তিনি তাঁর ‘ওফেলিয়া’ কবিতার শুরুতেই লিখেছেন—
“তবুও এ দুঃসাহস। বসন্তের সঞ্চিত সংগীত
যদি তুমি ছিঁড়ে দাও, ভেঙে দাও জিয়ানো কুসুম,
স্রোতগ যাত্রার ছায়া ফেলে দাও, দূর্বাদল ঘুম
যদিই জ্বালিয়ে দাও দীপ্ত লঘু কৈলাসের শীতে,”
‘ফুল ফুটুক না ফুটুক’-এ পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যে শব্দগুলো লিখেছেন, যেন অবচেতনের অন্দরে নিরন্তর টোকা দেয়।
“ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।
শান-বাঁধানো ফুটপাথে
পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ
কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে
হাসছে।
ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।”
তবে, ভাষা বা প্রকাশভঙ্গী তো সমুদ্রের স্রোতের মতোই প্রবাহমান! এখন সামাজিক মাধ্যমের যুগে আমরা যদি রবীন্দ্রভাবনা খুঁজতে বসি, তাহলে হবে? স্ট্যাটাস ভিডিয়ো’ ফেসবুকে লিখেছে,
“বাতাসে উড়িছে রং ভাঙেতে ধরিল নেশা
কারা যে পড়িল ড্রেনে বসন্ত এসে গেছে।”
‘ওই স্ট্যাটাস ভিডিয়ো’-ই আবার লিখেছে,
“ভাই গলা পর্যন্ত মদ খা। তবুও কেউ ভুল করে ভাং খাস না”। স্মৃতি দত্ত লিখেছেন—
“ড্রেনে কাদা মাখামাখি হাড়গোর ভেঙে গেল
বসন্ত এসে গেছে!”
কিচ্ছু বলার নেই! ভাষা ভেসে চলে। লিখনশৈলিতে বসন্তের ভাবনা বলে কথা!

