নিজস্ব সংবাদদাতা, নিউজস্কোপ বাংলা (Newscope Bangla): আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর দামামা বেজে গিয়েছে। আর নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, রাজ্য রাজনীতিতে নাটকীয় মোড় যেন ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই রাজনৈতিক নাটকের ভরকেন্দ্র হিসেবে বরাবরের মতোই উঠে এসেছে পূর্ব মেদিনীপুরের হাই-ভোল্টেজ কেন্দ্র নন্দীগ্রাম (Nandigram)। সদ্য এই এলাকা সাক্ষী থাকল এক অদ্ভুত এবং চমকপ্রদ রাজনৈতিক দলবদলের। এদিন সকালে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-র হাত ধরে যে তৃণমূল কর্মীরা পদ্ম শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন, বিকেলের আলো ফুরোনোর আগেই তাঁরা ফের ফিরে এলেন নিজেদের পুরোনো দলে।
সকালের ছবি: পদ্ম শিবিরে উচ্ছ্বাস
এদিন সকালে স্থানীয় রাজনীতি ছিল রীতিমতো সরগরম। ভারতীয় জনতা পার্টি (Bhartiya Janata Party) বা বিজেপির তরফ থেকে একটি বিশেষ যোগদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে প্রধান আকর্ষণ ছিলেন স্বয়ং বিরোধী দলনেতা। তাঁর উপস্থিতিতে এবং তাঁরই হাত থেকে দলীয় পতাকা গ্রহণ করে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর বেশ কয়েকজন সক্রিয় কর্মী ও স্থানীয় নেতা গেরুয়া শিবিরে নাম লেখান। সেই সময় ওই কর্মীদের গলায় শোনা গিয়েছিল শাসকদলের বিরুদ্ধে একরাশ ক্ষোভ এবং স্থানীয় স্তরে বঞ্চনার বিস্তর অভিযোগ। বিজেপি নেতৃত্বের তরফ থেকে এই যোগদানকে ‘বড়সড় ভাঙন’ বলে দাবি করা হয়। পদ্ম শিবিরের নেতারা বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই জানান, ২০২৬ সালের নির্বাচনে এখানকার মানুষ রাজ্যের শাসকদলকে যোগ্য জবাব দিতে প্রস্তুত।
বিকেলের ছবি: ঘাসফুলে প্রত্যাবর্তন
কিন্তু রাজনীতির ময়দানে কখন যে হাওয়া ঘুরে যায়, তা আগে থেকে বলা মুশকিল। সকালের সেই উচ্ছ্বাস কয়েক ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই যেন কর্পূরের মতো উবে যায়। বিকেল গড়াতেই দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। সকালে যাঁরা গেরুয়া পতাকা হাতে নিয়েছিলেন, তাঁরাই বিকেলের দিকে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের হাত ধরে ফের ঘাসফুল শিবিরে ফিরে আসেন। এই ঘটনায় স্বভাবতই তুমুল চাঞ্চল্য ছড়ায় গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে।
তৃণমূলে ফিরে আসার পর ওই কর্মীদের গলায় শোনা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর। তাঁরা দাবি করেন, তাঁদের ভুল বুঝিয়ে এবং নানারকম মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সকালে বিজেপিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু খুব দ্রুত নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে তাঁরা অবিলম্বে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলেই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এই প্রসঙ্গে স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বের হুঙ্কার, “নন্দীগ্রামের মাটি ঘাসফুলের শক্ত ঘাঁটি। এখানে কেউ সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত হলেও, শেষ পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন দেখেই ঘরে ফিরে আসবে। বিজেপির এই মিথ্যাচারের রাজনীতি এখানে বেশিদিন টিকবে না।”
ভোটারদের মনে বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়া
বিধানসভা নির্বাচনের আগে নন্দীগ্রাম বরাবরই একটি ‘প্রেস্টিজ ফাইট’ বা মর্যাদার লড়াইয়ের জায়গা। সাধারণ মানুষের মনে এই ধরনের ঘটনা এক গভীর প্রভাব ফেলছে। নন্দীগ্রামের এক সাধারণ ভোটারের কথায়, “সকালে দেখছি এক দলে, আর বিকেলে দেখছি অন্য দলে! আমরা সাধারণ মানুষ তাহলে কাদের বিশ্বাস করব?” এই প্রশ্নটা আজ শুধু নন্দীগ্রামের নয়, গোটা রাজ্যের। একদিকে শাসকদল যখন দাবি করছে যে তাদের উন্নয়নের জোয়ারে বিরোধীরা ভেসে যাচ্ছে, তখন বিরোধী দল বিজেপি লাগাতার অভিযোগ করছে যে শাসকদল ভয় দেখিয়ে এবং প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে কর্মীদের নিজেদের দিকে জোর করে টেনে রাখছে।
শুভেন্দু অধিকারী, যিনি একসময় তৃণমূলের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ছিলেন এবং বর্তমানে বিজেপির প্রধান মুখ, তাঁর নিজের গড়ে এই ধরনের ঘটনা গেরুয়া শিবিরের জন্য একটি বড় ধাক্কা বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। তাঁর উপস্থিতিতে যোগদান করার পরও কেন কর্মীরা দলে টিকতে পারলেন না, তা নিয়ে বিজেপির অন্দরেও শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। দলের একাংশের মতে, শাসকদলের প্রবল চাপের কারণেই ওই কর্মীরা ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। অন্যদিকে, তৃণমূল এই ঘটনাকে তাদের নৈতিক জয় হিসেবেই তুলে ধরছে।


Recent Comments