পরমাণু চুক্তি নিয়ে আমেরিকা (America) এবং ইরানের (Iran) মধ্যে চলা ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হল। আর এই আলোচনা ব্যর্থ হতেই চরম পদক্ষেপের পথে হাঁটল ওয়াশিংটন (Washington)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) রবিবার জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) দিয়ে সমস্ত রকম বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজের যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে ব্লক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামবাদে (Islamabad) অনুষ্ঠিত এই ম্যারাথন বৈঠকে তেহরান (Tehran) তাদের পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত অবস্থান থেকে পিছু হটতে অস্বীকার করায় এই চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।
রবিবার ট্রুথ সোশ্যাল (Truth Social) প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প একটি কড়া বার্তা দেন। তিনি লেখেন, “অবিলম্বে বিশ্বের সেরা নৌবাহিনী, ইউনাইটেড স্টেটস নেভি (United States Navy), হরমুজ প্রণালীতে প্রবেশ করতে বা সেখান থেকে বের হতে চাওয়া সমস্ত জাহাজকে অবরোধ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে।” এই জলপথটি কৌশলগত এবং বাণিজ্যিক দিক থেকে গোটা বিশ্বের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সারা বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। ট্রাম্প ইরানকে কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যে কোনও ইরানি আমাদের দিকে বা শান্তিপূর্ণ জাহাজের দিকে গুলি চালালে তাদের ধ্বংস করে দেওয়া হবে!”
জানা গেছে, ইসলামবাদে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স (JD Vance) এবং ইরানের সংসদীয় স্পিকার মহম্মদ বাঘের গালিবফ (Mohammad Bagher Ghalibaf)-এর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের মধ্যে সপ্তাহান্তে দীর্ঘক্ষণ ধরে এই বৈঠক চলে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই ছিল দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরের সরাসরি বৈঠক। তেহরানের প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন সে দেশের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি (Abbas Araghchi)। কিন্তু পরমাণু ইস্যুতে দুই দেশ কোনো ঐক্যমত্যে পৌঁছতে না পারায় ভ্যান্স কোনো চুক্তি ছাড়াই পাকিস্তান (Pakistan) থেকে ফিরে আসেন। ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা একটি অত্যন্ত সহজ প্রস্তাব নিয়ে এখান থেকে যাচ্ছি, এটিই আমাদের চূড়ান্ত এবং সেরা প্রস্তাব। ইরানিরা এটি মেনে নেয় কি না, সেটাই এখন দেখার।”
এর আগে আমেরিকা এবং ইজরায়েল (Israel) ওই ইসলামি রাষ্ট্রটির ওপর আক্রমণ চালানোর পর থেকেই হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে রেখেছিল তেহরান। শনিবার মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করে যে, মাইন অপসারণ অভিযানের অংশ হিসেবে তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজ ওই প্রণালী অতিক্রম করেছে। কিন্তু ইরান সঙ্গে সঙ্গে এই দাবি খারিজ করে দেয় এবং জানায় যে তারা মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে প্রণালী পার হতে বাধা দিয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম (CENTCOM) জানিয়েছিল যে ইউএসএস ফ্র্যাঙ্ক ই পিটারসন এবং ইউএসএস মাইকেল মারফি নামের দুটি গাইডেড-মিসাইল ডেসট্রয়ার ওই প্রণালীতে প্রবেশ করেছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর পাতা সামুদ্রিক মাইনগুলো অপসারণ করে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নিরাপদ যাতায়াতের পথ তৈরি করা। কিন্তু ইরান এই দাবি উড়িয়ে দিয়ে বলেছে যে, যেকোনো জাহাজের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের অধিকার শুধুমাত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে রয়েছে। এমনকি ইরানি ক্রুজ মিসাইল এবং ড্রোন মার্কিন জাহাজগুলোর দিকে তাক করে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে, যার ফলে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ পিছু হটতে বাধ্য হয়।
দুই পক্ষের এই বিপরীতমুখী দাবি এবং আলোচনার ব্যর্থতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে এই মুহূর্তে আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। হরমুজ প্রণালী অবরোধের এই নির্দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে, বিশেষ করে তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে চলেছে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে এই আন্তর্জাতিক সংকট কবে বা কীভাবে প্রশমিত হবে, তা নিয়ে সারা বিশ্ব চরম উদ্বিগ্ন।


Recent Comments