দেশের প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে এক অপূরণীয় ক্ষতি এবং ভারতীয় বায়ুসেনার জন্য একটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক খবর। অসমে রুটিন মহড়া চলাকালীন ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেল বায়ুসেনার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার, একটি সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান। এই মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বিমানে থাকা দুই কর্তব্যরত পাইলট। শুক্রবার সকালে বায়ুসেনার তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই দুঃসংবাদ দেশবাসীকে জানানো হয়েছে।
কী ঘটেছিল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়?
প্রাথমিক রিপোর্ট ও বায়ুসেনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অসমের জোরহাট বায়ুসেনা ঘাঁটি থেকে রুটিন প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে উড়ান ভরেছিল ওই যুদ্ধবিমানটি। কিন্তু উড়ান ভরার কিছুক্ষণ পরেই সেটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের রাডারের বাইরে চলে যায়। বায়ুসেনা জানিয়েছে, সন্ধ্যা ৭টা ৪২ মিনিট নাগাদ কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে বিমানটির শেষবার রেডিও যোগাযোগ সম্ভব হয়েছিল। এরপর থেকেই পাইলটদের দিক থেকে আর কোনও সাড়া মেলেনি। আচমকা এই অন্তর্ধানের পর সঙ্গে সঙ্গেই বায়ুসেনার তরফ থেকে নিবিড় তল্লাশি ও উদ্ধারকার্য শুরু করা হয়।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় মিলল ধ্বংসাবশেষ
রাতভর হেলিকপ্টার এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তল্লাশি চালানোর পর, শুক্রবার সকালে জোরহাট থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে কার্বি আংলং জেলার নীলিপ ব্লকের নিকটবর্তী এক দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে নিখোঁজ যুদ্ধবিমানটির ধ্বংসাবশেষের সন্ধান মেলে। স্থানীয় গ্রামবাসীরা পুলিশকে জানিয়েছেন যে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ তাঁরা ওই পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রচণ্ড জোরে একটি বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান। অনেকেই দূর থেকে আগুনের গোলা ও কালো ধোঁয়া আকাশের দিকে উড়তে দেখেন।
উদ্ধার কাজে বায়ুসেনার কপ্টারের পাশাপাশি কার্বি আংলং জেলার স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ এবং রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীও অংশ নেয়। এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম, খাড়া পাহাড়ি এবং ঘন জঙ্গলে ঘেরা হওয়ার কারণে পায়ে হেঁটে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবুও স্থানীয় গ্রামবাসীদের সহায়তায় উদ্ধারকারী দল শুক্রবার সকালের আলো ফুটতেই নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যায়। উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, মাটিতে আছড়ে পড়ার কারণে বিমানের বেশিরভাগ অংশই পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। সেখান থেকেই বিমানের যন্ত্রাংশ ও পাইলটদের দেহাংশ উদ্ধার করা হয়।
শোকস্তব্ধ গোটা দেশ ও প্রতিরক্ষামহল
শুক্রবার মাইক্রোব্লগিং সাইট এক্স (X)-এ একটি পোস্টে বায়ুসেনা জানিয়েছে যে, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় স্কোয়াড্রন লিডার অনুজ (Squadron Leader Anuj) এবং ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পূর্বেশ দুরাগকর (Flight Lieutenant Purvesh Duragkar) গুরুতর আঘাত পান এবং পরবর্তীতে তাঁদের মৃত্যু হয়। বায়ুসেনার তরফে আরও বলা হয়েছে, “এই শোকের মুহূর্তে বায়ুসেনার সমস্ত কর্মী আমাদের দুই বীর পাইলটের অকাল প্রয়াণে গভীর সমবেদনা জানাচ্ছেন এবং তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে আমরা সকলে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছি।”
দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং (Defence Minister Rajnath Singh) এই অনভিপ্রেত ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এক শোকবার্তায় জানিয়েছেন যে, দেশের সেবায় এবং আকাশসীমা সুরক্ষায় এই দুই সাহসী পাইলটের অপরিসীম আত্মত্যাগ দেশবাসী চিরকাল অত্যন্ত গর্ব ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখবে।
সুখোই-৩০ এমকেআই: বায়ুসেনার অন্যতম প্রধান শক্তি
রাশিয়ার (Russia) বিখ্যাত সুখোই কোম্পানির নকশায় তৈরি এবং পরবর্তীতে ভারতের হিন্দুস্থান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (Hindustan Aeronautics Limited) বা হ্যাল (HAL)-এর কারখানায় লাইসেন্সের অধীনে নির্মিত এই সুখোই-৩০ এমকেআই একটি টু-সিটার, মাল্টিরোল এবং দূরপাল্লার ফাইটার জেট। এটি মূলত এয়ার-টু-এয়ার এবং এয়ার-টু-গ্রাউন্ড, উভয় ধরনের কমব্যাট মিশনে সমান পারদর্শী। ১৯৯৭ সাল থেকে এটি ভারতীয় বায়ুসেনার অন্তর্ভুক্ত এবং দেশের আকাশসীমা প্রতিরক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে ভারতের হাতে ২৬০টিরও বেশি এমন উন্নত ফাইটার জেট রয়েছে।
তবে, সাম্প্রতিক অতীতে এই বিমানের দুর্ঘটনা নিয়ে প্রতিরক্ষা মহলে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের জুন মাসে মহারাষ্ট্রের (Maharashtra) নাসিক (Nashik) জেলায় একটি সুখোই বিমান ভেঙে পড়েছিল, যদিও সেই যাত্রায় পাইলটরা নিরাপদে ইজেক্ট করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এছাড়া ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে মধ্যপ্রদেশের (Madhya Pradesh) গোয়ালিয়র (Gwalior) বায়ুসেনা ঘাঁটি থেকে ওড়ার পরও একই ধরনের সুখোই বিমান দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।
উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ
কী কারণে এই অত্যাধুনিক বিমানটি আচমকা দুর্ঘটনার কবলে পড়ল, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জোর চর্চা শুরু হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটি, আবহাওয়াজনিত সমস্যা, নাকি অন্য কোনও অজ্ঞাত কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য বায়ুসেনার তরফ থেকে একটি উচ্চ পর্যায়ের ‘কোর্ট অফ ইনকোয়ারি’ (Court of Inquiry)-র নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তের বিস্তারিত রিপোর্ট এলেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার আসল কারণটি সবার সামনে স্পষ্ট হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আপাতত নিহত দুই বীর যোদ্ধার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছে গোটা দেশ।
