কলকাতা: গত ১লা জুন থেকে কলকাতা (Kolkata) সহ সমগ্র রাজ্য জুড়ে সরকারি বাসে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে যাতায়াতের ঐতিহাসিক নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্য সরকার। এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটালেও, মুদ্রার ওপিঠ বলছে অন্য কথা। সরকারি এই জনমুখী প্রকল্পের জেরে এখন কার্যত অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে রাজ্যের বেসরকারি বাস ও মিনিবাস শিল্প। বেসরকারি বাস মালিক ও শ্রমিকদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।
এই জ্বলন্ত ইস্যুতেই এবার মুখ খুললেন জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেটের (Joint Council of Bus Syndicates) সম্পাদক তপন ব্যানার্জী (Tapan Banerjee)।পরিবহন মহলের একাংশের মতে, সরকারি বাসে মহিলারা বিনামূল্যে যাতায়াত করায় বেসরকারি বাসের যাত্রী সংখ্যা এক ধাক্কায় অনেকটাই কমে গিয়েছে। তপন ব্যানার্জী জানান, “১লা জুন এই নিয়ম চালুর সময় যখন সংবাদমাধ্যম আমাদের মতামত চেয়েছিল, আমি বলেছিলাম— এটা সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্ত, এখানে আমাদের বলার কিছু নেই। তবে আমি একটা সপ্তাহ সময় চেয়েছিলাম পরিস্থিতি খতিয়ে দেখার জন্য।”
এক সপ্তাহ পর কলকাতা এবং বিভিন্ন জেলা থেকে যে খবর আসছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে বেসরকারি গণপরিবহনকে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।শ্রমিকদের মধ্যে আলোড়ন ও আর্থিক ক্ষতিইতিমধ্যেই কলকাতা এবং জেলার বাস রুটগুলোতে কর্মরত বাস শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। যাত্রী কমে যাওয়ায় প্রতিদিনের টিকিট বিক্রির পরিমাণ বা ‘সেল’ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে দৈনিক আয় কমেছে অনেকটাই। বিশেষ করে দূরপাল্লার বা জেলার বাসগুলোতে যেখানে ‘মাহিনা প্রথা’ বা নির্দিষ্ট বেতনের ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে মালিকদের পক্ষে সেই হারে শ্রমিকদের বেতন দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পিঠ ঠেকে যাওয়া দেওয়াল
বেসরকারি বাস মালিকদের সমস্যার এখানেই শেষ নয়। সম্প্রতি লিটার প্রতি ডিজেলের দাম ১০ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবহনের খরচ এক ধাক্কায় আকাশ ছুঁয়েছে। কলকাতা থেকে দিঘা (Digha), শিলিগুড়ি (Siliguri) কিংবা উত্তরবঙ্গ (North Bengal) ও দক্ষিণবঙ্গের (South Bengal) বিভিন্ন জেলাগামী বাসগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিদিন শুধু জ্বালানি বাবদ অতিরিক্ত ৪,০০০ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বাসের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও লুব্রিকেন্টের (Lubricant) দাম।টোল প্লাজার ‘কামড়’ ও আইনের ফাঁকতপন ব্যানার্জীর অভিযোগ, একদিকে জাতীয় সড়ক (National Highway) ও রাজ্য সড়কগুলোতে (State Highway) বেআইনিভাবে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে টোটো ও অটো।
অন্যদিকে রয়েছে টোল প্লাজার (Toll Plaza) বিশাল খরচের বোঝা। উত্তরবঙ্গের কিছু কিছু টোলে একটি বাসকে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত টোল ট্যাক্স দিতে হয়। দৈনিক আয় যেখানে তলানিতে, সেখানে এত টাকা টোল দেওয়া কীভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে ওড়িশা (Odisha) সহ প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি জানান, সেখানে জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গণপরিবহনের ক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এমনকি কলকাতার অটো চালকরাও নিজেদের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে নিয়েছেন।
মোটোর ভেহিকল (Motor Vehicle) আইন অনুযায়ী অটো ‘স্টেজ ক্যারেজ’ (Stage Carriage) নাকি ‘কনট্যাক্ট ক্যারেজ’ (Contact Carriage)— তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পরিবহন দপ্তরকে অটোর নির্দিষ্ট ভাড়া তালিকা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তিনি।উপেক্ষিত বেসরকারি পরিবহন, সমাধানের আর্জিসম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের একটি পরিবহন সংক্রান্ত আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন তপন ব্যানার্জী, যেখানে দেশের ১০১টি শহরের আধুনিকীকরণ নিয়ে কথা হয়। ওই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের ৫টি শহরের নাম রয়েছে।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি সেখানে বেশ কিছু প্রস্তাবও জমা দেন। তবে তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, এই মুহূর্তে রাজ্যে বেসরকারি পরিবহনকে বাঁচাতে গেলে একটি নিরপেক্ষ ‘রেগুলেটরি কমিটি’ (Regulatory Committee) গঠন করা অত্যন্ত জরুরি।


Recent Comments