আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকেই তৎপরতা শুরু করে দিল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। শুক্রবার কচি শহরে রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিস্তৃত এবং গভীর পর্যালোচনা বৈঠক করল কমিশনের ফুল বেঞ্চ । মুখ্য নির্বাচন কমিশনার শ্রী জ্ঞানেশ কুমার (Shri Gyanesh Kumar)-এর নেতৃত্বে এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নির্বাচন কমিশনার ডঃ সুখবীর সিং সান্ধু (Dr. Sukhbir Singh Sandhu) এবং ডঃ বিবেক যোশী (Dr. Vivek Joshi) । এই সফরের মূল লক্ষ্য ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণের সমস্ত পরিকাঠামোগত দিক খতিয়ে দেখা এবং রাজনৈতিক দলগুলির মতামত বা পরামর্শ গ্রহণ করা ।
রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে দীর্ঘ মতবিনিময় এই পর্যালোচনা সফরের অন্যতম প্রধান অংশ ছিল বিভিন্ন স্বীকৃত জাতীয় ও রাজ্য স্তরের রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কমিশনের সরাসরি আলোচনা । এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আম আদমি পার্টি (Aam Aadmi Party), বহুজন সমাজ পার্টি (Bahujan Samaj Party), ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি – মার্কসবাদী (Communist Party of India – Marxist) এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস (Indian National Congress)-এর মতো প্রথম সারির জাতীয় দলগুলি অংশ নেয় । পাশাপাশি, রাজ্যের আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে উপস্থিত ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (Communist Party of India), ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (Indian Union Muslim League), কেরালা কংগ্রেস (Kerala Congress) এবং রেভল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টি (Revolutionary Socialist Party) ।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বেশিরভাগ দলই রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্য কমিশনের ভূয়সী প্রশংসা করেছে । বুথ লেভেল অফিসারদের (BLOs) অক্লান্ত পরিশ্রম এবং ভালো কাজেরও তারিফ করা হয়েছে বিভিন্ন দলীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ।
তবে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট বা দিনক্ষণ চূড়ান্ত করার আগে কমিশনকে স্থানীয় ও আঞ্চলিক উৎসবগুলির কথা বিশেষভাবে মাথায় রাখার জন্য কয়েকটি দলের তরফ থেকে বিনীত অনুরোধ জানানো হয়েছে । পাশাপাশি, বয়স্ক নাগরিক এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (PwD) ভোটারদের ভোটদান প্রক্রিয়া যাতে আরও সহজ ও বাধাহীন হয়, তার জন্য বিশেষ পরিকাঠামোগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও উঠেছে ।
সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়গুলিও এদিনের বৈঠকে জোরালোভাবে উঠে আসে। ভোটে পেশীশক্তি ও অর্থের যথেচ্ছ প্রভাব, মদ এবং বিনামূল্যে উপহার বিতরণের মতো বেআইনি কাজ রুখতে কমিশনকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আর্জি জানিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলি । এছাড়া, বর্তমান ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial Intelligence – AI) এবং সিন্থেটিকভাবে তৈরি বা সম্পাদিত বিকৃত কনটেন্টের মাধ্যমে নির্বাচনের সুস্থ পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার গভীর আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি ।
কমিশনের আশ্বাস ও কড়া বার্তা রাজনৈতিক দলগুলির সমস্ত উদ্বেগের জবাব দিতে গিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে । তিনি উল্লেখ করেন যে, এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্যই হল, কোনো যোগ্য ভোটার যেন তালিকা থেকে বাদ না পড়েন এবং কোনো অযোগ্য ব্যক্তি যেন বেআইনিভাবে তালিকায় ঢুকে না পড়েন । তিনি সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে আরও মনে করিয়ে দেন যে, নাম তোলা, বাদ দেওয়া বা সংশোধনের জন্য এখনও ৬/৭/৮ নম্বর ফর্ম (Forms 6/7/8) জমা দেওয়া যেতে পারে । কারো কোনো আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী জেলাশাসক বা মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে সরাসরি আপিল করা যাবে ।
নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখার পূর্ণ আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, অবাধ এবং সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে কমিশন বদ্ধপরিকর । নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা চোখে পড়লে রাজনৈতিক দলগুলিকে দেরি না করে সি-ভিজিল (cVIGIL) অ্যাপ ব্যবহার করে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি । কেরালায় ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে এমন এক নজির স্থাপন করার ডাক দিয়েছেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার, যা শুধু গোটা ভারত (India) নয়, সমগ্র বিশ্বের কাছে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বা মডেল হয়ে উঠবে ।
প্রশাসনের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক ও নির্দেশিকা রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে সফল বৈঠকের পর, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির প্রধান, আইজি (IGs), ডিআইজি (DIGs), জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (DEOs) এবং পুলিশ সুপারদের (SPs) সঙ্গে একটি বিস্তারিত ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে কমিশন । এই ম্যারাথন বৈঠকে ইভিএম (EVM) পরিচালনা, লজিস্টিকস, ভোটকর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, বেআইনি জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করা, ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলার মতো প্রতিটি সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হয় ।
কমিশনের তরফে সমস্ত প্রশাসনিক কর্তাদের সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে কাজ করার এবং যেকোনো ধরনের প্রলোভনমূলক বেআইনি কার্যকলাপ কঠোর হাতে দমন করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে । সাধারণ ভোটারদের সুবিধার্থে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে র্যাম্প, হুইলচেয়ার এবং পর্যাপ্ত পানীয় জলের মতো ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সুবিধা (AMFs) সুনিশ্চিত করার জন্য জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের বিশেষ নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন ।
