সপ্তাহান্তের শুরুতেই মধ্যবিত্তের হেঁশেলে ফের আগুন! ছুটির দিনের সকালে বাজার করতে গিয়ে বা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের হিসেব মেলাতে গিয়ে মাথায় হাত পড়তে চলেছে আমজনতার। কারণ, এক ধাক্কায় অনেকটাই দাম বেড়ে গেল রান্নার গ্যাসের। নয়াদিল্লি (New Delhi) থেকে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, শুক্রবার গভীর রাতেই ১৪.২ কেজি ওজনের বাড়িতে ব্যবহৃত রান্নার গ্যাস বা এলপিজি (LPG) সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ৬০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্র সরকার। এতদিন যে সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের খরচ হত ৮৭৯ টাকা, আজ, শনিবার সকাল থেকে সেই একই গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে পকেট থেকে খসবে ৯৩৯ টাকা।
কেন এই হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি? আন্তর্জাতিক মহলের দিকে নজর রাখলেই এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির আসল কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য (Middle East) জুড়ে বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। আর এই অস্থির পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। ভারত (India) তার দৈনন্দিন জ্বালানির চাহিদার একটা বড় অংশের জন্যই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের দামের ওঠাপড়ার প্রভাব দেশের বাজারে পড়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। সরকারের অন্দরমহল সূত্রে খবর, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতির জেরে অচিরেই দেশে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের একটা কালো মেঘ তৈরি হয়েছে।
জারি এসমা বা জরুরি অবস্থা: পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে এবং ভবিষ্যতে যাতে সাধারণ মানুষকে চরম বিপদে পড়তে না হয়, তার জন্য আগাম সতর্কতা হিসেবে দেশজুড়ে এমার্জেন্সি বা জরুরি ক্ষমতাসম্পন্ন আইন এসমা (ESMA – Essential Services Maintenance Act) জারি করেছে কেন্দ্র। দেশের সবকটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানিগুলিকে কড়া ভাষায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বা ঘরোয়া বাজারে যেন গ্যাস এবং তেলের সরবরাহ কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। যেকোনো আপৎকালীন পরিস্থিতির মোকাবিলা করার জন্য রান্নার গ্যাসের উৎপাদন এবং মজুত সর্বোচ্চ পর্যায়ে চাঙ্গা রাখতে বলা হয়েছে।
বুকিংয়ের নিয়মে বড়সড় বদল: জ্বালানি সংকটের খবর ছড়ালে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। অনেকেই ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাড়িতে অতিরিক্ত গ্যাস মজুত করে রাখার চেষ্টা করেন। এই ‘প্যানিক বুকিং’ বা আতঙ্কে অতিরিক্ত বুকিং করার প্রবণতা রুখতে সরকার গ্যাস বুকিংয়ের নিয়মেও কড়া পরিবর্তন এনেছে। সরকারের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, এখন থেকে একটি গ্যাস বুকিং করার পর দ্বিতীয়বার গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়ার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ২১ দিনের ব্যবধান থাকতে হবে। অর্থাৎ, আপনি একটি সিলিন্ডার হাতে পাওয়ার পর ২১ দিন পার না হলে কোনোভাবেই দ্বিতীয় সিলিন্ডারের জন্য বুকিং করতে পারবেন না। উল্লেখ্য, এর আগে এই সময়সীমা বা বাধ্যবাধকতা ছিল মাত্র ১৫ দিনের। সাপ্লাই চেইনে বা সরবরাহের ঘাটতির আশঙ্কায় যাতে মজুত এলপিজি ভাণ্ডারের ভারসাম্য কোনোভাবেই নষ্ট না হয়, তার জন্যই এই কড়া পদক্ষেপ।
বাণিজ্যিক গ্যাসের দামেও ছ্যাঁকা: শুধু বাড়ির রান্নার গ্যাসই নয়, পাল্লা দিয়ে দাম বেড়েছে বাণিজ্যিক গ্যাসেরও। হোটেল, রেস্তোরাঁ বা চায়ের দোকানে ব্যবহৃত ১৯ কেজি ওজনের বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ১১৪ টাকা ৫০ পয়সা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যার ফলে এই সিলিন্ডারের নতুন দাম দাঁড়িয়েছে ১৯৯০ টাকা। বাণিজ্যিক গ্যাসের এই বিপুল দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়বে রেস্তোরাঁ বা হোটেলের খাবারের বিলে। অর্থাৎ, এবার থেকে বাইরে খেতে গেলেও সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত গ্যাঁটের কড়ি খরচ করতে হবে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে দেশের অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তার সরাসরি কোপ এসে পড়ল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ, আর তার ওপর রান্নার গ্যাসের এই নয়া মূল্যবৃদ্ধি— দুইয়ে মিলে মাসের বাজেট সামলাতে হিমশিম খেতে হবে দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলিকে।
