নিউস্কোপ বাংলা-র বিশেষ প্রতিবেদনঃ সকালের চা থেকে শুরু করে রাতের ডিনার— বাঙালির দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম অপরিহার্য অঙ্গ হলো রান্নার গ্যাস। কিন্তু সেই গ্যাস সিলিন্ডার নিয়েই এবার দেশজুড়ে শুরু হয়েছে চরম হাহাকার। শহর কলকাতা (Kolkata) থেকে শুরু করে গোটা ভারত (India) জুড়েই এখন একটাই ছবি, গ্যাসের এজেন্সির বাইরে মানুষের দীর্ঘ লাইন। চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ। শুধু হেঁশেল নয়, সিএনজি-র অভাবে কার্যত স্তব্ধ হওয়ার জোগাড় গণপরিবহণ ব্যবস্থাও। পেট্রোল পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও মিলছে না জ্বালানি। কিন্তু কেন হঠাৎ এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি? আগামী দিনগুলোতেই বা কী হতে চলেছে?
সঙ্কটের নেপথ্যে আন্তর্জাতিক সংঘাত
মূল সমস্যার সূত্রপাত পশ্চিম এশিয়া (West Asia)। সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States), ইজরায়েল (Israel) এবং ইরান (Iran)-এর মধ্যে শুরু হওয়া ভয়ংকর সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালী বর্তমানে এই সংঘাতের জেরে কার্যত অবরুদ্ধ। সেখান দিয়ে তেল ও গ্যাসের পণ্যবাহী জাহাজ যাতায়াত করতে পারছে না। সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার কারণেই হুড়মুড়িয়ে কমছে এলপিজি ও সিএনজি-র জোগান।
মধ্যবিত্তের পকেটে কোপ ও হাহাকার
জোগানে ঘাটতির পাশাপাশি কোপ পড়েছে আমজনতার পকেটেও। এক ধাক্কায় ঘরোয়া রান্নার গ্যাসের দাম সিলিন্ডার প্রতি ৬০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে শহরে একটি ১৪.২ কেজির ডোমেস্টিক সিলিন্ডারের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৩৯ টাকা। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের দামও একলাফে ১১৪ টাকার বেশি বাড়ানো হয়েছে।
দাম বাড়লেও যে সহজে গ্যাস মিলছে, এমনটা একেবারেই নয়। অনেকেই গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার আতঙ্কে তড়িঘড়ি নতুন সিলিন্ডার বুক করার চেষ্টা করছেন। শহরের বিভিন্ন প্রান্তের গ্যাস ডিলারদের কাছে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আছড়ে পড়ছে। ডিলাররাও অসহায়, কারণ তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত স্টকই এসে পৌঁছচ্ছে না। অনেক জায়গায় অসাধু উপায়ে কালোবাজারির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সরকারি বিধিনিষেধ ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং মজুতদারি রুখতে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এবার থেকে একটি সিলিন্ডার বুক করার পর অন্তত ২৫ দিন না কাটলে দ্বিতীয় সিলিন্ডার বুক করা যাবে না। অর্থাৎ, ‘লক-ইন পিরিয়ড’ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্যিক গ্যাসের সরবরাহ কার্যত অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে। সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, বর্তমানে যেটুকু গ্যাস মজুত আছে, তা শুধুমাত্র গৃহস্থালি এবং হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জরুরি ক্ষেত্রেই অগ্রাধিকার পাবে। ফলে শহরের অনেক নামিদামি রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে রাস্তার ধারের ছোট খাবারের দোকানগুলিও বাধ্য হয়ে ঝাঁপ বন্ধ করছে। রোজগার হারানোর ভয়ে দিন গুনছেন বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।
রাস্তায় অমিল অটো, যাত্রী ভোগান্তি চরমে
এলপিজি-র পাশাপাশি সিএনজি পাম্পগুলিতেও হাহাকার চরমে পৌঁছেছে। গ্যাস সরবরাহ তলানিতে এসে ঠেকায় চরম বিপাকে পড়েছেন শহরের অটোচালকরা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাচ্ছেন না তাঁরা। এর ফলে রাস্তায় অটোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছে। নিত্যযাত্রীদের যাতায়াতে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে। অফিস টাইমে বাস বা মেট্রোয় বাদুড়ঝোলা ভিড়, আর রাস্তায় বেরিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অটোর জন্য অপেক্ষা— এটাই এখন শহরের রোজকার রোজনামচা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারের আশ্বাস বনাম চরম অনিশ্চয়তা
সঙ্কট মেটাতে ইতিমধ্যেই তেল কোম্পানিগুলোকে, বিশেষ করে রিলায়েন্স (Reliance)-এর মতো বড় সংস্থাগুলোকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের শোধনাগারগুলোতে দিনরাত এক করে কাজ চলছে। নয়াদিল্লি (New Delhi) থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, আতঙ্কের কোনও কারণ নেই। সরকার বিকল্প পথ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া (Australia) এবং অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্র থেকে গ্যাস আমদানির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

