সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ডামাডোলে ফের একবার উত্তপ্ত জাতীয় রাজনীতি। বিরোধী দলগুলো এবার সরাসরি নিশানা করেছে ভারতের (India) প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে (Gyanesh Kumar)। তাঁকে ইমপিচ বা পদচ্যুত করার জন্য সংসদে একটি মোশন বা প্রস্তাব আনার পরিকল্পনা করছে বিরোধীরা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দেশের সংবিধানে এই বিষয়ে ঠিক কী নিয়ম কানুন রয়েছে? একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চাইলেই কি সহজে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব?
ভারতের সংবিধানের ৩২৪ (৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) একজন বিচারককে যে পদ্ধতিতে এবং যে কারণে পদচ্যুত করা যায়, ঠিক সেই পদ্ধতি ছাড়া প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে তাঁর পদ থেকে অপসারণ করা যাবে না।” এর পাশাপাশি বলা হয়েছে যে, অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের কেবল সিইসি-র সুপারিশক্রমেই পদচ্যুত করা সম্ভব।
এই অনুচ্ছেদের ওপর ভিত্তি করেই ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সংসদে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার (নিয়োগ, চাকরির শর্তাবলি এবং কার্যকাল) আইন, ২০২৩’ পাস হয়। এই আইনের ১১ নম্বর ধারায় পদত্যাগ এবং অপসারণের বিস্তারিত প্রক্রিয়া উল্লেখ রয়েছে, যা মূলত সংবিধানের আগের নিয়মেরই প্রতিচ্ছবি।
সুপ্রিম কোর্টের বিচারককে অপসারণের প্রক্রিয়াটি সংবিধানের ১২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ১৯৬৮ সালের জাজেস (ইনকোয়ারি) অ্যাক্ট বা বিচারক (তদন্ত) আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ক্ষেত্রেও হুবহু এই একই নিয়ম প্রযোজ্য।
এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়াটিকে মূলত কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়:
প্রথম ধাপ – প্রস্তাব পেশ: ১৯৬৮ সালের আইনের ৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতিকে (President) অপসারণের আবেদন জানানোর জন্য সংসদে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বা মোশন আনতে হয়। লোকসভায় (Lok Sabha) এই প্রস্তাব আনলে অন্তত ১০০ জন সাংসদের স্বাক্ষর প্রয়োজন। অন্যদিকে, রাজ্যসভায় (Rajya Sabha) প্রস্তাব পেশ করতে হলে অন্তত ৫০ জন সাংসদকে তাতে স্বাক্ষর করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ – স্পিকার বা চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত: প্রস্তাবটি জমা পড়ার পর লোকসভার স্পিকার (Speaker) অথবা রাজ্যসভার চেয়ারম্যান (Chairman) সেটি গ্রহণ বা বাতিল করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
তৃতীয় ধাপ – তদন্ত কমিটি গঠন: যদি স্পিকার বা চেয়ারম্যান প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন, তবে অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য তাঁকে একটি তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হয়।
চতুর্থ ধাপ – সংসদে ভোটাভুটি ও চূড়ান্ত সিলমোহর: যদি এই তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অসদাচরণ বা অক্ষমতার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে, তবে যে কক্ষে প্রস্তাবটি ঝুলে আছে সেখানে ভোটাভুটির জন্য তা পেশ করা হয়। সংসদে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রস্তাবটি পাস হলে, তবেই তা রাষ্ট্রপতির কাছে অপসারণের চূড়ান্ত নির্দেশের জন্য পাঠানো হয়।
আইনের পাতা ঘাঁটলে এটা একেবারে স্পষ্ট যে, জ্ঞানেশ কুমারকে পদচ্যুত করার রাস্তা বিরোধীদের জন্য মোটেও মসৃণ হবে না। বর্তমান শাসক দলের প্রবল সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং এই আইনি প্রক্রিয়ার জটিলতা বিরোধীদের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কলকাতা (Kolkata) সফরে গিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সিইসি-কে কালো পতাকা এবং ‘গো ব্যাক’ স্লোগানের মুখে পড়তে হলেও, সংসদীয় অঙ্কে তাঁকে সরানো এক প্রকার পাহাড় প্রমাণ কাজ। আগামী দিনে এই রাজনৈতিক টানাপোড়েন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার।

