অশোক সেনগুপ্ত
সকাল ৮টা ১৭ মিনিট। সমাজমাধ্যমে টুকটাক শুরু হয়েছে চিহ্ণ-সহ অধিকার প্রয়োগের আঙুলের ছবি। হোয়াটসঅ্যাপে আমাকে প্রথমে নিজের আঙুলের ছবি পাঠালেন এক শিক্ষাবিদ, তথা প্রাক্তন উপাচার্য। পরে মুঠোফোনে পাঠালেন ভোটযাত্রায় দুই বৃদ্ধার ছবি— ‘বলিষ্ঠ নারীরা পথে’। একজনের হাতে পা-ওয়ালা লাঠি। জানালেন, ওঁরা তাঁর মা-কাকীমা।
সকাল ৮টা ৪৩ মিনিট। এর পর মুঠোফোনে ভেসে এলো সুধীবিনোদ পালের চিহ্ণ-সহ আঙুল তুলে সহাস্য মুখের ছবি। সঙ্গে প্রায় একই ভঙ্গীতে তাঁর স্ত্রী। রাসবিহারি কেন্দ্রের ভোটদাতা তাঁরা। কে এই সুধীবিনোদ? বিগত দিনের প্রবাদপ্রতিম আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী, হাজারো আখ্যানের জন্মদাতা, ইতিহাসের অধ্যতম নায়ক রাধাবিনোদ পালের পৌত্র।
ইতিমধ্যে একাধিক রাজনৈতিক দলের সাংবাদিকদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্লাবন বইতে শুরু করেছে নেতানেত্রীদের আঙুল তুলে গণতন্ত্রের উৎসবে অংশ নেওয়ার সহাস্যছবি। এবং, অকুস্থলে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তর। পুত্র পবনকে নিয়ে দাপুটে নেতা অর্জুন সিহ, বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, সোনারপুর দক্ষিণের প্রার্থী মহাভারতের দ্রৌপদী রূপা গঙ্গোপাধ্যায়। প্রতিক্রিয়া জানালেন তাঁরা। খিদিরপুরের সেন্ট থমাস স্কুলে মাথায় গেরুয়া পাগড়ি পড়ে ভোট দিতে এলেন কলকাতা বন্দরের বিজেপি প্রার্থী রাকেশ সিংহ। ভোট দান করে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ওঁরা।
সাতসকালেই ভবানীপুরে হনুমান মন্দিরে পুজো দিয়ে ৭৭ নং ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের ভারতীয় জনতা পার্টির মনোনীত প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী।ভবানীপুরে কন্ট্রোল রুম পরিদর্শন করে ভোট দিলেন। ঘটনাবহুল মুহূর্ত তৈরি হল সকাল ৯.৩০টার কিছুটা পর। সেখানে কার্যত মুখোমুখি এসে পড়েন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারী। ব্যাপক উত্তেজনা তৈরি হয় সেখানে। মমতাকে কটাক্ষ ছুড়ে দেন শুভেন্দুবাবু।
সাধারণত ভোটের দিন সকাল থেকে তেমন বাইরে দেখা যায় না তৃণমূলনেত্রীকে। তবে এদিন সকাল থেকে বুথে বুথে ঘুরতে দেখা যায় মমতাকে। চেতলা, চক্রবেড়িয়া বুথে পৌঁছন।ভোটের সকালে মেজাজ হারালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুথে বুথে পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে মেজাজ হারালেন। বললেন, “কিছু অবজার্ভার এসেছে বাইরে থেকে। বিজেপি যা বলছে তাই করছে। চক্রবেড়িয়ায় গিয়ে দেখে এসো আমাদের সব পোস্টার খুলে দিয়েছে। এভাবে ভোট হয়? ভোট তো মানুষ দেবেন, পুলিশও নয়, সিকিওরিটিও নয়। আর কয়েকজনকে নতুন এনেছে। তারা যা ইচ্ছে করছে। এলাকায় সন্ত্রাস করছে।”
সকাল সকাল ভবানীপুরে বুথ পরিদর্শনে এসেছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দিকে দিকে প্রচুর তৃণমূল কর্মীকে দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগেই গ্রেফতার করা হয়েছে। বুধবার ভবানীপুরেই ভোটের শুরুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তা নিয়ে মুখ খুললেন তৃণমূলের সেকেণ্ড ইন কমান্ড। তিনি দাবি করেন, ‘প্রথম দফায় বিজেপি কুপোকাত হয়ে গিয়েছে। এক্তিয়ার বহির্ভূত কাজ করছে। অবজার্ভাররা নির্বাচন কমিশনের চোখ ও কান হিসেবে কাজ করবে। এরপর রিপোর্ট দেবে এসপিকে ও নির্বাচন কমিশনকে। এরপর নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা যে কি করা উচিৎ। কিন্তু তৃণমূলের যাঁদের বিরুদ্ধে কোনও কেস নেই, তাঁদের আটক করা হচ্ছে অন্যায়ভাবে।’
অন্য দিকে, সকাল থেকে মন্দিরে মন্দিরে পুজো দিয়ে ভবানীপুরে চক্রবেড়িয়া এসে পৌঁছন শুভেন্দুবাবুও। সেই সময়ই কার্যত মুখোমুখি চলে আসেন তাঁরা। দু’জনকে একফ্রেমে বন্দি করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন সকলে। তবে রাজনৈতিক সৌজন্য বিনিময় হতে দেখা যায়নি।
ভোট দিতে এসেও দিতে পারলেন না চিরঞ্জিত চক্রবর্তী৷ সকালবেলায় সস্ত্রীক ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে আসেন অভিনেতা৷ চারুচন্দ্র কলেজে এসে ইভিএম খারাপ থাকায় ভোট দিতে পারলেন না অভিনেতা ও বিদায়ী বিধায়ক চিরঞ্জিত। রাসবিহারী কেন্দ্রের চারুচন্দ্র কলেজে ১৭০ নম্বর পার্টে দীর্ঘক্ষণ ধরে ইভিএম খারাপ। মানুষ লাইন দিয়েও ভোট না দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। চিরঞ্জিত চক্রবর্তীও ফিরে গেলেন৷ তবে ইভিএম ঠিক হলেই, তিনি আবার সময় করে আসবেন ভোট দিতে৷ চিরঞ্জিত বললেন, ভোটিং মেশিন ঠিক হলে ঘুরে তাঁকে আবার পরে আসতে হবে।
এর পর এমনভাবে মুঠোফোনে সামাজিক মাধ্যমের দেওয়াল খবর ও ছবিতে এমন ভাসতে শুরু করল, তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।বালিগঞ্জ কেন্দ্রের গুণী প্রার্থী ডঃ শতরূপা গলায় পরিচয়পত্র ঝুলিয়ে ছবি ভাসিয়ে দিলেন সামাজিক মাধ্যমে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ভ্রাতৃসম সাংবাদিক অর্পিত বসু রাজস্থানে বসে তাঁর চোখে দেখছেন গণতন্ত্রের উৎসব। একগুচ্ছ ইমোজি-সহ সামাজিক মাধ্যমে লিখলেন, “প্রথম আড়াই ঘন্টায় ছবি-টা বেশ পরিস্কার। আজ রেকর্ড সংখ্যক selfie আপলোড হতে চলেছে।সব মিলিয়ে, টানটান উত্তেজনা।”


Recent Comments