নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে তৈরি হওয়া ফাটল এবার আরও স্পষ্ট আকার ধারণ করল। লোকসভার মুখ্য সচেতক (Chief Whip) পদ থেকে অপসারিত হওয়ার পর এবার দলের বারাসাত সাংগঠনিক জেলা সভাপতির পদ থেকেও পদত্যাগ করলেন প্রবীণ সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। দলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিস্ফোরক চিঠি পাঠিয়ে তিনি নিজের ইস্তফা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ভোটকুশলী সংস্থা আই-প্যাক (I-PAC) এবং দলের একাংশের আচরণ নিয়ে উগরে দিয়েছেন দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।
’ভুঁইফোঁড় সংস্থা দিয়ে কঠিন কাজ হয় না’: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরামর্শ
সুব্রত বক্সীকে পাঠানো চিঠিতে বারাসাতের চারবারের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার নির্বাচনী ব্যর্থতার নৈতিক দায় স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে তার পাশাপাশি নাম না করে ভোটকুশলী সংস্থা আই-প্যাক-এর তীব্র সমালোচনা করেছেন। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছেন:
”নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আপনি যদি আগের দিনগুলোর মতো সৎ, নিষ্ঠাবান ও পুরনো কর্মীদের নিয়ে কাজ করেন, তবে দলের ভাবমূর্তি আবারও উজ্জ্বল হবে। কোনো ভুঁইফোঁড় (ফ্লাই-বাই-নাইট) সংস্থা দিয়ে কঠিন রাজনৈতিক কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব বলে আমি মনে করি না।”
পরবর্তীকালে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, এই বহিরাগত সংস্থার অল্পবয়সী ছেলেমেয়েরা দলের প্রবীণ ও সার্বক্ষণিক কর্মীদের সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার এবং হুমকি দেওয়ার রাজনীতি করেছে, যা দলের ভেতরে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
নারীবিদ্বেষ এবং একাংশের আচরণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ
পদত্যাগের পর দলীয় নেতাদের একাংশের আচরণ নিয়েও অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তৃণমূলের এই প্রবীণ নেত্রী। পার্লামেন্টের ভেতরে কতিপয় নেতার আচরণ ও ভাষার ব্যবহার নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে তিনি জানান, যারা সংসদে বসে অশালীন ভাষা বা ‘কাঁচা খিস্তি’ করেন কিংবা যাদের মধ্যে নারীবিদ্বেষী মানসিকতা রয়েছে, তাদের আধিপত্য বা প্রাধান্য তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না।
রাজনৈতিক মহলের মতে, লোকসভায় দলের মুখ্য সচেতকের পদ থেকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, যা এবার পদত্যাগের মাধ্যমে প্রকাশ্যে এল।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা ও সাংগঠনিক অবক্ষয়
চিঠিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদার শুধুমাত্র সাংগঠনিক বিষয়েই নয়, বরং রাজ্যের প্রশাসনিক ও শাসনতান্ত্রিক অবক্ষয় নিয়েও মুখ খুলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন:
সাম্প্রতিককালে রাজ্যে ঘটে যাওয়া অপরাধ ও দুর্নীতির ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে রাজনীতিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, শালীনতা ও নৈতিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি স্পষ্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলের সর্বস্তরে এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধীকরণ বা ‘ক্রিমিনালাইজেশন’ ছড়িয়ে পড়েছে, যা দলের আসন সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ।
চার দশকের আনুগত্য এবং রাজনৈতিক জল্পনা
১৯৭৬ সাল থেকে ছাত্র রাজনীতি এবং ১৯৮৪ সাল থেকে সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পথ চলা শুরু করেছিলেন পেশায় চিকিৎসক কাকলি ঘোষ দস্তিদার। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে লিখেছিলেন, “চার দশকের আনুগত্যের সঠিক পুরস্কার পেলাম।”
জেলা সভাপতির পদ ও দলের মহিলা উইং-এর দায়িত্ব ছাড়ার পাশাপাশি তিনি সাংসদ পদ থেকেও ইস্তফা দিতে পারেন বলে তাঁর পারিবারিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে। এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে তাঁকে বিশেষ ‘Y’ ক্যাটাগরির নিরাপত্তা প্রদান করায় রাজনৈতিক মহলে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে তীব্র জল্পনা শুরু হয়েছে।


Recent Comments