অশোক সেনগুপ্ত
জন্ম ১৯৬০-এর ২২ মে। অভিজাত, সম্পন্ন পরিবারের সন্তান অনীক দত্ত ছিলেন বামপন্থী মনোভাবাপন্ন। এ কারণে তাঁকে বিগত রাজ্য সরকারের আমলে একাধিকবার সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বুধবার চিরকালের মতো চলে গেলেন সেই প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব। অনীক দত্ত ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্র চন্দ্র দত্তের পৌত্র।

কলকাতার পাঠভবন ও সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের প্রাক্তনী অনীক দত্ত সামাজিক মাধ্যমে ছিলেন রীতিমত সক্রিয়। গত বৃহস্পতিবার এবং তার পরেও তাঁকে ফোনে এবং সামাজিক মাধ্যমে ঘনিষ্ঠরা কেউ কেউ জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তাঁর কন্যা ঐশী দু’বছর আগে স্টকহোম থেকে বাবাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছায় কেক পাঠিয়েছিলেন। সেই কেক এবং কেক কাটার ছবি বৃহস্পতিবার ফেসবুকে ভাসিয়েছিলেন অনীকবাবু। পরিচালক অতনু রায় সেই দিন তাঁদের একটি সাক্ষাৎকারের ছবি সহ লেখেন, “শুভ জন্মদিন, অনীকদা। খুব ভাল থাকুন, নতুন ছবির ঘোষণা আসুক তাড়াতাড়ি।”

২০১২-তে নিজের লেখা ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ চলচ্চিত্র পরিচালনার মধ্য দিয়ে তার পরিচালক জীবন শুরু হয়। হিট ছবিটির স্যুটিং হয় শ্রীরামপুর রাজবাটী-তে। এরপর ’১৩-তে তিনি শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ নিয়ে কাজ করেন। ‘১৪-তে লেখেন ‘গ্যাং অফ ঘোস্টস’। তাঁর তৃতীয় পরিচালিত ছবি মেঘনাদবধ রহস্য। ২০১৭, ’১৯, ’২০, ’২২ ও ’২৫-এ লেখেন যথাক্রমে ‘মেঘনাদবধ রহস্য’, ‘ভবিষ্যতের ভূত’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’, ‘অপরাজিত’ ও ‘যত কান্ড কলকাতাতেই’। এই পাঁচটি ছবির পরিচালনাও করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত (২৫ নভেম্বর ১৮৭৮ – ১৫ এপ্রিল ১৯৬২) ছিলেন ব্যাংকার। তিনি কুমিল্লা ব্যাংকিং কর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা। দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে তিনি ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠার পিছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর পুত্র বটকৃষ্ণ দত্ত ভারতের ব্যাংকিং জগতে পরিচিত ছিলেন বটুক দত্ত হিসাবে।
১৯৪৬ সালে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তৎকালীন গভর্নর চিন্তামন দ্বারকানাথ দেশমুখের পরামর্শে নিউ স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তার সমস্ত সম্পত্তি স্থানান্তর করে কুমিল্লা ব্যাংকিং কর্পোরেশনের সাথে একীভূত হয়। ভারতের স্বাধীনতা ও দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে নরেন্দ্রচন্দ্র দত্ত জ্যোতিষ চন্দ্র দাসের সাথে মিলে কুমিল্লা ব্যাংকিং কর্পোরেশন, কুমিল্লা ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক, বেঙ্গল সেন্ট্রাল ব্যাংক ও হুগলি ব্যাঙ্ক একীভূতকরণ সম্পন্ন করার মাধ্যমে কলকাতায় ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রতিষ্ঠা করেন।

সেই পরিবারের সন্তান অনীক দত্ত রাজনীতির শিকার হন। ২০২২-এর মে মাসের মাঝপর্বেমুক্তি পায় ‘অপরাজিত’ (Aparajito)। ১৯৫৫ সালে বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ‘পথের পাঁচালি’ নামক যে ‘মাস্টারপিস’ তৈরি করেছিলেন সত্যজিৎ রায়, তার নেপথ্যে কতটা সংগ্রাম ছিল? সেই গল্পই ২০২২ সালে এসে পর্দায় তুলে ধরেন পরিচালক অনীক। প্রথমটায় বাংলা জুড়ে খুব বেশি প্রেক্ষাগৃহে জায়গা না পেলেও মাত্র ১ সপ্তাহেই রাজ্যের বিভিন্ন মাল্টিপ্লেক্স, সিনেমাহলগুলিতে জায়গা করে নেয় ওই ছবি। প্রশংসায় ভরান সিনেসমালোচকরা। রমরমিয়ে চলে ‘অপরাজিত’। বক্সঅফিসে লক্ষ্মীলাভ নিয়ে গোড়ার দিকে শঙ্কা থাকলেও প্রথম এক সপ্তাহের মার্কশিট বলে দেয়, এই ছবি বিগ বাজেটের সিনেমাকেও রীতিমতো টেক্কা দিচ্ছে।

ওই সিনেমা নিয়ে সামাজিক মাধ্যম জুড়ে হইচই হলেও, এমনকী দর্শকরা হল থেকে বেরিয়ে এসে ইতিবাচক রিভিউ দিলেও অনীকের ‘অপরাজিত’র ঠাঁই হয়নি নন্দনে। সরকারি প্রেক্ষাগৃহে এই সিনেমার স্লট না পাওয়া নিয়ে প্রথম থেকেই বেজায় শোরগোল শুরু হয়েছিল। তবে আশা করা হয়েছিল, এক সপ্তাহে সিনেমার সাফল্য দেখে হয়তো নন্দন কর্তৃপক্ষ জিতু কামাল (Jeetu Kamal), অনীকের (Anik Dutta) এই সিনেমাকে জায়গা দেবেন।
দর্শকদের সেই প্রত্যাশা আপাতত বিশ বাঁও জলে! কারণ দ্বিতীয় সপ্তাহেও নন্দনে ‘মিনি’, ‘কিশমিশ’, ‘রাবণ’ এমনকী মুক্তির আগেই ‘বেলাশুরু’ স্লট পেলেও জায়গা পায় নি ‘অপরাজিত’।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। অনীক দত্তর শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ তখন মুক্তির অপেক্ষায়। সেই সময়েই অভিনেতা আবির চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অসহযোগিতা এবং ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের নোংরা রাজনীতি নিয়ে মারাত্মক ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন পরিচালক। সংবাদমাধ্যমে একাধিক বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “শারীরিক অসুস্থতার কারণে শুটিংয়ে থাকতে না পারাটা অত্যন্ত যন্ত্রণার। শরীর যেভাবে অবনতি হচ্ছে, তাতে মনে হয় না আর নতুন করে ছবি বানাতে পারব। এটাই হয়তো আমার শেষ ছবি।”
তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, ওটা হয়তো ক্ষণিকের ক্লান্তি বা অভিমান। কিন্তু আজ বোঝা যাচ্ছে, এক বিদায়ী ভবিষ্যৎবাণী অলক্ষ্যে লিখে রেখেছিলেন তিনি।


Recent Comments