নিজস্ব সংবাদদাতা: কয়েক মিনিটের ঝড় যেন বদলে দিল গোটা শহরের চেহারা। ভরদুপুরে আচমকা কালো মেঘে ঢেকে যায় আকাশ, তারপরই শুরু হয় প্রবল কালবৈশাখীর দাপট। ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রবিদ্যুৎ আর মুষলধারে বৃষ্টিতে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে কলকাতা ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা। রাস্তায় রাস্তায় জল জমে নাজেহাল সাধারণ মানুষ, থমকে যায় ট্রেন ও মেট্রো পরিষেবা, উপড়ে পড়ে একের পর এক গাছ।
দুপুর গড়াতেই কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় ঝড়ের তাণ্ডব। কোথাও বিশাল গাছ ভেঙে রাস্তার উপর পড়েছে, কোথাও আবার বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রেড রোড, সল্টলেক, বেহালা, লেক গার্ডেন্স, গলফগ্রিন-সহ একাধিক এলাকায় ব্যাপক জল জমে যান চলাচল কার্যত স্তব্ধ হয়ে পড়ে। বহু গাড়ি মাঝরাস্তায় বিকল হয়ে পড়ায় বাড়তে থাকে যানজট। জল ঠেলে পথ চলতে দেখা যায় সাধারণ মানুষকে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নিত্যযাত্রীরা। মধ্যমগ্রাম সংলগ্ন এলাকায় ওভারহেড তারে সমস্যা এবং লাইনের উপর গাছ পড়ে যাওয়ায় শিয়ালদহের একাধিক শাখায় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শিয়ালদহ-বারাসত ও ক্যানিং লাইনে দীর্ঘক্ষণ পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় স্টেশনগুলিতে যাত্রীদের ভিড় উপচে পড়ে। হাওড়া শাখাতেও ট্রেন চলাচলে প্রভাব পড়ে।
মেট্রো পরিষেবাও ঝড়ের ধাক্কা সামলাতে পারেনি। কবি সুভাষ ও শহিদ ক্ষুদিরাম স্টেশনের মাঝখানে মেট্রো ট্র্যাকে গাছের ডাল ভেঙে পড়ায় সাময়িকভাবে পরিষেবা বন্ধ রাখতে হয়। অন্যদিকে শহিদ ক্ষুদিরাম স্টেশনের টিনের শেডের একাংশ উড়ে যাওয়ায় স্টেশনের ভিতরে জল ঢুকতে শুরু করে। আচমকা এই পরিস্থিতিতে আতঙ্ক ছড়ায় যাত্রীদের মধ্যে।
ঝড়ের তীব্রতা এতটাই ছিল যে দক্ষিণ কলকাতার সাউথ সিটি শপিং মলের কাচ ভেঙে পড়ে এবং বড় হোর্ডিং ছিঁড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে মলের ভিতরে। যদিও কোনও হতাহতের খবর মেলেনি, তবে অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় গাছ ভেঙে পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। সল্টলেকে একটি গাড়ির উপর বিশাল গাছ পড়ে গাড়িটি দুমড়েমুচড়ে যায়। সৌভাগ্যবশত তখন গাড়ির ভিতরে কেউ ছিলেন না। বেহালাতেও ঝড়ের মধ্যে গাড়ির উপর গাছ পড়লেও প্রাণে বেঁচে যান এক দম্পতি।
এদিকে প্রবল বৃষ্টিতে কলকাতা বিমানবন্দর এলাকাতেও জল জমে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। রানওয়েতে জল জমার কারণে সাময়িকভাবে বিমান পরিষেবাতেও সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে খবর।
আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, উত্তর ওড়িশা সংলগ্ন ঘূর্ণাবর্ত এবং বিস্তৃত অক্ষরেখার জেরে দক্ষিণবঙ্গে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প ঢুকছে। তার ফলেই এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া তৈরি হয়েছে। কলকাতা-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনা, উত্তর ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি ও পূর্ব মেদিনীপুরে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে বলেও জানিয়েছে হাওয়া অফিস।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় কলকাতা পুলিশ, দমকল ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ইতিমধ্যেই নামানো হয়েছে। প্রশাসনের তরফে অপ্রয়োজনীয় বাইরে না বেরোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জল জমা এলাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

Recent Comments