Release ID : 2283989
ভারতের সামুদ্রিক সীমানার প্রহরা
যুদ্ধ, সমুদ্র সমীক্ষা ও উপকূল প্রতিরক্ষায় তিন শ্রেণীর দেশীয় নৌযান
নীলগিরি, সন্ধায়ক ও অর্ণালা শ্রেণীর নৌযান ভারতের সামুদ্রিক প্রতিরক্ষার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সম্প্রতি কমিশনপ্রাপ্ত আইএনএস দুনাগিরি, আইএনএস সংশোধক, আইএনএস আগ্রয় এবং আইএনএস মহেন্দ্রগিরি এই সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। উচ্চমাত্রার দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত এই নৌযানগুলি আত্মনির্ভর ভারত উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করছে।
ভারতের বহুস্তরীয় নৌ-সক্ষমতা
ভারতীয় নৌবাহিনী প্রায় ১১,০৯৮ কিলোমিটার উপকূলরেখা, ২৪ লক্ষ বর্গকিলোমিটার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং দেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৯০% পণ্য পরিবহণের সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
নীলগিরি শ্রেণীর স্টেলথ ফ্রিগেট সমুদ্রযুদ্ধে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অভিযান পরিচালনার জন্য তৈরি।
সন্ধায়ক শ্রেণীর সমীক্ষা জাহাজ সমুদ্রতল মানচিত্র, নৌপথের তথ্য ও সমুদ্রবিষয়ক উপাত্ত সংগ্রহ করে। এতে নৌ-অভিযান, সামুদ্রিক বাণিজ্য ও নীল অর্থনীতি শক্তিশালী হয়।
অর্ণালা শ্রেণীর অগভীর জলসীমার সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ-বিরোধী নৌযান উপকূলবর্তী এলাকায় সাবমেরিন শনাক্ত ও মোকাবিলার জন্য তৈরি।
এই তিন শ্রেণীর নৌযান মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের কাজও করতে পারে।
দেশীয় জাহাজ নির্মাণে এই সাফল্য ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করেছে এবং নিজস্ব যুদ্ধজাহাজ নির্মাণে দেশের সক্ষমতার পরিচয় বহন করছে।
স্টেলথ ফ্রিগেট : সমুদ্রযুদ্ধে ভারতের শক্তি
স্টেলথ ফ্রিগেট ভারতীয় নৌবাহিনীর সমুদ্রযুদ্ধ সক্ষমতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এগুলি বিমানবাহী রণতরীর সুরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং দূরবর্তী সাগরসীমায় নৌ-অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উন্নত অস্ত্র, সেন্সর ও স্টেলথ প্রযুক্তির কারণে এগুলি সহজে শনাক্ত করা যায় না।
প্রকল্প ১৭এ-র আওতায় নির্মিত নীলগিরি শ্রেণীর জাহাজগুলি হল আইএনএস নীলগিরি, হিমগিরি, তারাগিরি, উদয়গিরি, দুনাগিরি, মহেন্দ্রগিরি এবং নির্মীয়মাণ বিন্ধ্যগিরি।
মাজাগন ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড, মুম্বই চারটি এবং গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, কলকাতা তিনটি জাহাজ নির্মাণ করছে। সম্প্রতি আইএনএস দুনাগিরি কমিশনপ্রাপ্ত হয়েছে। আইএনএস মহেন্দ্রগিরি ২০২৬ সালের ১১ জুলাই বিশাখাপত্তনমে কমিশনপ্রাপ্ত হয়। এই যুদ্ধজাহাজগুলি ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করছে এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
প্রকল্প ১৭এ-র নীলগিরি শ্রেণীর স্টেলথ ফ্রিগেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য
আকার : প্রায় ১৪৯ মিটার দীর্ঘ, ওজন প্রায় ৬,৬৭০ টন।
চালনা ব্যবস্থা : কম্বাইন্ড ডিজেল অর গ্যাস (CODOG) প্রযুক্তি।
গতি : সর্বোচ্চ ২৮ নট (প্রায় ৫২ কিলোমিটার/ঘণ্টা)।
আঘাত হানার ক্ষমতা : দূরপাল্লার জাহাজ ও স্থলভাগের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম সুপারসনিক সারফেস-টু-সারফেস ক্ষেপণাস্ত্র।
আকাশ সীমায় প্রতিরক্ষা : ব্রহ্মোস, মাঝারি পাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং ক্লোজ-ইন গান।
সেন্সর ও বিমান সুবিধা : উন্নত রাডার, হাল-মাউন্টেড সোনার এবং হেলিকপ্টার। সোনার প্রযুক্তির মাধ্যমে জলের নিচে থাকা সাবমেরিন শনাক্ত করা যায়।
সমীক্ষা জাহাজ : নিরাপদ নৌপথ ও সমৃদ্ধ সমুদ্র অর্থনীতির ভিত্তি
সমীক্ষা জাহাজ সমুদ্রতল ও উপকূলবর্তী জলসীমার মানচিত্র তৈরি করে ভারতীয় নৌবাহিনীর সমুদ্র সমীক্ষা সক্ষমতা বাড়ায়। সঠিক নৌ-মানচিত্র যুদ্ধজাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করে। এগুলি নীল অর্থনীতি, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই সক্ষমতা বাড়াতে ভারতীয় নৌবাহিনীতে সন্ধায়ক শ্রেণীর দেশীয় সমীক্ষা জাহাজ যুক্ত হচ্ছে। এই শ্রেণীর জাহাজগুলি হল আইএনএস সন্ধায়ক, নির্দেশক, ইক্ষক এবং সংশোধক। গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড, কলকাতা এগুলি নির্মাণ করেছে। সম্প্রতি আইএনএস সংশোধক কমিশনপ্রাপ্ত হয়েছে। এই জাহাজগুলি ভারতের সামুদ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নজরদারি আরও শক্তিশালী করছে এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্র সমীক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের নেতৃত্বকে আরও সুদৃঢ় করছে।
সন্ধায়ক শ্রেণীর সমীক্ষা জাহাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য
আকার : প্রায় ১১০ মিটার দীর্ঘ, ওজন প্রায় ৩,৪০০ টন।
গতি ও পাল্লা : সর্বোচ্চ ১৮ নটের বেশি গতি এবং ৬,৫০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অভিযানের সক্ষমতা।
কর্মীসংখ্যা : প্রায় ১৭৮ জন।
সমীক্ষা সরঞ্জাম: মাল্টি-বিম ইকো সাউন্ডার, সাইড-স্ক্যান সোনার এবং স্বয়ংক্রিয় জলের নিচের যান (AUV)। এগুলির মাধ্যমে সমুদ্রতলের বিস্তারিত মানচিত্র তৈরি করা যায়।
অতিরিক্ত সক্ষমতা : হেলিকপ্টার পরিচালনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে হাসপাতাল জাহাজ হিসাবে ব্যবহার করা যায়।
২০১৯-২৪ সময়কালে ভারতের সমুদ্র সমীক্ষা বিশেষজ্ঞরা ৮৯ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা সমীক্ষা করে ৯৬টি নৌ-মানচিত্র প্রস্তুত করেছেন। এতে আমাদের বহু বন্ধুদেশ উপকৃত হয়েছে।
অগভীর জলসীমায় সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ প্রতিরোধী নৌযান : উপকূলের নির্ভরযোগ্য প্রহরী
অগভীর সাগরসীমায় সাবমেরিন প্রতিরোধী নৌযান ভারতীয় নৌবাহিনীর উপকূল প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করে। উপকূলবর্তী অগভীর সাগরসীমায় ডুবোজাহাজ শনাক্ত ও মোকাবিলায় এগুলির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের কাজও করতে পারে।
এই সক্ষমতা বাড়াতে ভারতীয় নৌবাহিনীতে অর্ণালা শ্রেণীর দেশীয় নৌযান যুক্ত হচ্ছে। এই শ্রেণির আটটি নৌযান হল অর্ণালা, আন্দ্রোথ, অঞ্জাদ্বীপ, আমিনি, অভয়, আগ্রয়, অক্ষয় এবং অজয়।
গার্ডেন রিচ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড এবং এলঅ্যান্ডটি শিপবিল্ডিং যৌথভাবে এগুলি নির্মাণ করছে। সম্প্রতি আইএনএস আগ্রয় কমিশনপ্রাপ্ত হয়েছে। একই সঙ্গে মাহে শ্রেণীর আরও নৌযান নির্মাণাধীন রয়েছে। এগুলি ভারতের উপকূলবর্তী জলসীমার নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করবে এবং বড় যুদ্ধজাহাজগুলিকে গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় সহায়তা করবে।
অর্ণালা শ্রেণীর নৌযানের প্রধান বৈশিষ্ট্য
আকার : প্রায় ৭৭.৬ মিটার দীর্ঘ, ওজন প্রায় ৯০০ টন।
চালনা ব্যবস্থা : ওয়াটারজেট প্রযুক্তি, যা অগভীর জলসীমায় দ্রুত ও সহজে চলাচলে সহায়তা করে।
গতি : সর্বোচ্চ ২৫ নট।
অস্ত্র : হালকা টর্পেডো এবং সাবমেরিনবিরোধী রকেট।
সেন্সর : অগভীর জলসীমার সোনার এবং উন্নত কমব্যাট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, যা সেন্সর ও অস্ত্রের মধ্যে সমন্বয় ঘটায়।
যুদ্ধের গণ্ডির বাইরে কৌশলগত গুরুত্ব
নীলগিরি, সন্ধায়ক ও অর্ণালা শ্রেণীর নৌযান শুধু নৌযুদ্ধের সক্ষমতা বাড়ায় না, দেশের নিরাপত্তা, আত্মনির্ভর ভারত, সামুদ্রিক উন্নয়ন এবং ভারতের দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত লক্ষ্যকেও শক্তিশালী করে।
এই দেশীয় যুদ্ধজাহাজগুলি প্রতিরক্ষা উৎপাদন, কর্মসংস্থান, সামুদ্রিক কূটনীতি, নীল অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা রপ্তানিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
ভারতের সামুদ্রকেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ আরও সুরক্ষিত
নীলগিরি, সন্ধায়ক ও অর্ণালা শ্রেণীর নৌযান ভারতের নৌ-সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এগুলি সমুদ্রযুদ্ধ, সমুদ্র সমীক্ষা এবং উপকূলবর্তী ডুবোজাহাজ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভারতীয় নৌবাহিনীর ওয়ারশিপ ডিজাইন ব্যুরো এগুলির নকশা তৈরি করেছে এবং দেশের জাহাজ নির্মাণ কারখানায় এগুলি নির্মিত হয়েছে। এর ফলে প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আত্মনির্ভরতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। এই দেশীয় যুদ্ধজাহাজগুলি জাহাজ নির্মাণ শিল্প, এমএসএমই, কর্মসংস্থান, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং SAGAR ও MAHASAGAR চিন্তাধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দেশের স্বার্থ রক্ষায় এগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।


Recent Comments