দেশের অভ্যন্তরীণ এবং সীমান্ত সুরক্ষার নিরিখে অন্যতম স্পর্শকাতর অংশ হিসেবে পরিচিত ‘চিকেনস নেক’ (Chicken’s Neck)। এই করিডোরটি ভৌগলিক এবং কৌশলগত কারণে ভারত (India)-এর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবার এই অতি-স্পর্শকাতর এলাকার নিরাপত্তা আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি করতে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার। বিশেষ সূত্রে জানা গিয়েছে, শিলিগুড়ি (Siliguri)-তে তৈরি হতে চলেছে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স বা বিএসএফ (BSF)-এর আস্ত একটি নতুন হেড কোয়ার্টার। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশ বা আইটিবিপি (ITBP)-র একটি অত্যাধুনিক বেসক্যাম্পও স্থাপন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal)-এর উত্তরের এই ছোট্ট অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করিডোরটি দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিকে যুক্ত করে রেখেছে। মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই সঙ্কীর্ণ অঞ্চলটি যদি কোনও কারণে অবরুদ্ধ হয়ে যায়, তবে সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দেশের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এই করিডোরের নিকটবর্তী অঞ্চলে রয়েছে একাধিক প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত। একদিকে যেমন রয়েছে নেপাল (Nepal) এবং ভুটান (Bhutan), অন্যদিকে রয়েছে বাংলাদেশ (Bangladesh)। এছাড়াও খুব কাছেই রয়েছে চীন (China)-এর সীমান্ত। ফলস্বরূপ, যেকোনো আন্তর্জাতিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে এই স্থানটি একটি সফট টার্গেট বা সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।
কেন শিলিগুড়িতেই এই জোড়া প্রস্তুতি?
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে উত্তর সীমান্তে প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসী মনোভাব এবং ক্রমাগত পরিকাঠামো উন্নয়নের জেরে নয়াদিল্লিকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতেই শিলিগুড়িতে নিরাপত্তা বাহিনীর আধুনিকীকরণ এবং স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছিল।
বিএসএফ-এর নতুন হেড কোয়ার্টার তৈরি হলে, বাংলাদেশ এবং অন্যান্য সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলিতে নজরদারি এবং অপারেশনাল কাজ আরও নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। আগে বাহিনীর জওয়ানদের যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা লজিস্টিক্যাল বা পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হতে হতো। শিলিগুড়িতে সরাসরি হেড কোয়ার্টার তৈরি হলে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সঠিক রণনীতি প্রস্তুত করা এবং বাহিনী মোতায়েনের ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে।
অন্যদিকে, আইটিবিপি মূলত পাহাড়ি এবং দুর্গম অঞ্চলে সীমান্ত সুরক্ষায় পারদর্শী। চীন সীমান্তের কাছে তাদের নজরদারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিলিগুড়িতে তাদের একটি বেসক্যাম্প তৈরি হওয়ার অর্থ হলো, যেকোনো আপৎকালীন পরিস্থিতিতে তারা খুব দ্রুত প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি-র দিকে অগ্রসর হতে পারবে। এই বেসক্যাম্পটি আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র, নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত থাকবে বলে প্রশাসনিক স্তরে খবর।
জাতীয় নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিলেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত সেই উদ্বেগের একটি উপযুক্ত জবাব বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। শুধুমাত্র সাময়িকভাবে সামরিক বাহিনী মোতায়েন নয়, বরং সেখানে স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে তোলার এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় কোনো রকম আপস করতে প্রস্তুত নয় প্রশাসন।
ইতিমধ্যেই এই দুটি মেগা প্রকল্পের জন্য জমি চিহ্নিতকরণ এবং প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে খুব শীঘ্রই যাতে মূল নির্মাণের কাজ শুরু করা যায়, তার জন্য উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশিকাও জারি হয়েছে। এই নির্মাণ কাজগুলি সম্পূর্ণ হলে একদিকে যেমন শিলিগুড়ি শহর তথা সমগ্র উত্তরবঙ্গের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবে, তেমনই পরিকাঠামোগত উন্নয়নের জেরে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।


Recent Comments