রাজ্য রাজনীতিতে ফের এক অভূতপূর্ব এবং নাটকীয় মোড়! দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ ও জল্পনা এবার একেবারে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress) দলের অন্দরে ফাটল যে কতটা চওড়া হয়েছে, তা বুধবার সকালে বিধানসভার অলিন্দে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকেই স্পষ্ট। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে রীতিমতো বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন দলেরই এক বড় অংশের বিধায়ক। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বিদ্রোহীদের বয়ানে মমতা (Mamata) এখনও দলের ‘সভানেত্রী’।
কিন্তু বিধানসভার অন্দরে তাঁরা দলনেতা হিসেবে আর পুরোনো নেতৃত্বকে মানতে নারাজ।বেশ কিছুদিন ধরেই দলের ভেতরে একটি ‘সই-কাণ্ড’ নিয়ে জলঘোলা হচ্ছিল। সেই বিতর্কই এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার সূত্রপাত হয় বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে বর্ষীয়ান তৃণমূল বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে (Sobhandeb Chattopadhyay) এই পদের জন্য প্রস্তাব দিয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দলের একাংশ এই সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি।
তাঁদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিধানসভায় আরও আগ্রাসী এবং তরুণ নেতৃত্বের প্রয়োজন। আর সেই দাবি থেকেই শুরু হয় প্রকাশ্য বিদ্রোহ।বুধবার সকালেই বিধানসভায় একেবারে অপ্রত্যাশিত এক দৃশ্যের সাক্ষী থাকল রাজ্যবাসী। মমতার হাতছাড়া কি তবে হতে চলেছে দলের রাশ? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলের আনাচে-কানাচে।
কারণ, এদিন বিধানসভায় বিদ্রোহী এবং দল থেকে বহিষ্কৃত নেতা ঋতব্রত (Ritabrata) সদর্পে প্রবেশ করেন। আর তিনি একা ছিলেন না, তাঁর সঙ্গে ছিল ৫৯ জন তৃণমূল বিধায়কের পূর্ণ সমর্থনের চিঠি। স্পিকারের কাছে এই চিঠি জমা দিয়ে তাঁরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিধানসভায় তাঁদের ‘দলনেতা’ হিসেবে তাঁরা ঋতব্রতকেই দেখতে চান।
এদিন সকালে স্পিকারের ঘরে যখন এই চিঠি জমা পড়ছে, তখন বিদ্রোহী নেতার পাশে রীতিমতো চাঁদের হাট। দলদাস না হয়ে নিজেদের মত প্রতিষ্ঠায় এদিন বিধানসভায় সশরীরে পৌঁছে গিয়েছিলেন অরূপ রায় (Arup Roy), শিউলি সাহা (Shiuli Saha), এবং আখরুজ্জামান (Akhruzzaman)। এছাড়াও এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রথম সারিতে দেখা গিয়েছে সন্দীপন সাহা (Sandipan Saha), সাবিনা ইয়াসমিন (Sabina Yeasmin), চন্দ্রনাথ সিংহ (Chandranath Sinha), এবং প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Prasun Bandyopadhyay) মতো হেভিওয়েট বিধায়কদের। দলের এতজন প্রভাবশালী নেতা ও বিধায়ক একসঙ্গে প্রকাশ্যে শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় স্বাভাবিকভাবেই চরম অস্বস্তিতে পড়েছে শাসক শিবির।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার রাজনীতিতে এমন ঘটনা বিরল। একদিকে বিদ্রোহী বিধায়করা বলছেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই তাঁদের সুপ্রিমো বা সভানেত্রী, তাঁর প্রতি তাঁদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে, বিধানসভার ফ্লোর ম্যানেজমেন্ট এবং বিরোধী দলনেতার পদের ক্ষেত্রে তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে হাঁটছেন। এই দ্বিমুখী অবস্থান আসলে দলের অন্দরে তৈরি হওয়া গভীর সাংগঠনিক সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।
শোভনদেবের মতো একজন সম্মানীয় এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে গিয়ে ৫৯ জন বিধায়কের এই একজোট হওয়া প্রমাণ করে যে, দলের ভেতরের সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে।এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, স্পিকার এই চিঠির ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন? যদি সত্যিই এই ৫৯ জন বিধায়কের দাবি মেনে নেওয়া হয়, তবে তৃণমূলের অন্দরের ক্ষমতার রাশ কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে। দলের নিয়ন্ত্রণ থাকবে একদিকে, আর বিধানসভার নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে অন্য শিবিরের হাতে।
আপাতত গোটা রাজ্যের নজর স্পিকারের সিদ্ধান্তের দিকে এবং অবশ্যই দলের সভানেত্রীর পরবর্তী রাজনৈতিক চালের দিকে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু হয় না, কিন্তু আজকের এই ঘটনা বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে যে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।


Recent Comments