আমাদের সমাজে দীর্ঘকাল ধরে একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে যে, বাড়ির কাজ বা সংসার সামলানো কোনো পেশা নয়, বরং তা কেবলই কর্তব্যের অংশ। কিন্তু এই চিরাচরিত ধারণায় বড়সড় পরিবর্তনের ডাক দিল ভারতের শীর্ষ আদালত। গৃহিণীদের শ্রমকে স্বীকৃতি দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, এঁরা কেবল ‘হোমমেকার’ বা গৃহিণী নন, বরং এঁরা দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর। তাঁদের এই পরিশ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য অপরিসীম, যা উপেক্ষা করার কোনো অবকাশ নেই।
কী জানাল শীর্ষ আদালত?
সম্প্রতি একটি মামলার শুনানিকালে বিচারপতি সঞ্জয় করোল (Justice Sanjay Karol)-এর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই মন্তব্য করে। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, বাড়ির মহিলারা প্রতিদিন যে হারে শ্রম দেন, তার আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করলে তা মাসিক ৩০ হাজার টাকার কম হওয়া উচিত নয়। বিচারপতিদের মতে, একজন গৃহিণী যখন সংসার সামলান, তখন তিনি পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছেন। পরবর্তী প্রজন্মের চরিত্র গঠন থেকে শুরু করে তাদের সুশিক্ষিত করে তোলা—এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় মা বা গৃহিণীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সংসারের কাজে শ্রম ও অর্থনৈতিক মূল্য
সাধারণত জিডিপি (GDP)-র হিসেব বা জাতীয় আয়ের পরিসংখ্যানে বাড়ির গৃহিণীদের কাজকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আদালতের এই পর্যবেক্ষণ সেই অন্ধকার দিকটিতেই আলোকপাত করেছে। গৃহিণীরা রান্না করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সন্তান লালন-পালন এবং প্রবীণদের যত্ন নেওয়ার মতো যে বহুমুখী কাজ করেন, তার পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। তারা বছরের ৩৬৫ দিন, ২৪ ঘণ্টা নিরলস পরিশ্রম করে যান।
আদালত মনে করিয়ে দিয়েছে, যদি বাইরের কোনো পেশাদার এজেন্সি এই সব কাজের দায়িত্ব নিত, তবে তার খরচ হতো আকাশছোঁয়া। তাই গৃহিণীদের এই অবদানকে কেবলমাত্র ‘ভালোবাসার কাজ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।নতুন প্রজন্মের দিশারীদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম—যারা আগামী দিনে ভারত (India)-কে নেতৃত্ব দেবে, তাদের নৈতিক মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব গড়ার কারিগর হলেন বাড়ির মায়েরা। আদালত জোর দিয়ে বলেছে যে, একজন মা বা গৃহিণী যেভাবে ধৈর্য ও নিষ্ঠার সাথে বাড়ির পরিবেশ বজায় রাখেন, তা কোনো করপোরেট চাকরির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই অপরিসীম ত্যাগের যথাযথ স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।
কেন এই পরিবর্তন জরুরি?
আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় গৃহিণীদের আত্মত্যাগ বহু ক্ষেত্রেই ‘অদৃশ্য’ থেকে যায়। তাঁদের এই কাজকে পেশাদার স্বীকৃতি দিলে কেবল তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই করা হবে না, বরং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আদালতের এই মন্তব্য আগামী দিনে পারিবারিক আইন ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।


Recent Comments