রাজ্যের স্কুলগুলিতে পড়ুয়াদের দুপুরের খাবারের মান ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের ঘোষণা করা হলো এবারের রাজ্য বাজেটে। ২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ বাজেট (Budget) পেশ করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত (Swapan Dasgupta) জানান, এবার থেকে কলকাতা (Kolkata) পুরনিগম এলাকার সরকারি স্কুলগুলির পড়ুয়াদের কাছে আরও পুষ্টিকর মধ্যাহ্নভোজ পৌঁছে দিতে ইসকন (ISKCON)-এর সহযোগিতা নেওয়া হবে। তবে এই ঘোষণার পরই শিক্ষামহলের অন্দরে শুরু হয়েছে এক নতুন বিতর্ক, যার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলার চিরপরিচিত ‘ডিম-সংস্কৃতি’।
বরাদ্দ বৃদ্ধি ও রাঁধুনিদের মুখে হাসি
বিগত বেশ কিছু সময় ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিড-ডে মিল (Mid-Day Meal)-এর খাবারের মান এবং স্বচ্ছতা নিয়ে একাধিক অভাব-অভিযোগের কথা সামনে আসছিল। সেই সমস্ত পরিকাঠামোগত ত্রুটি দূর করতে রাজ্য সরকার যেমন প্রশাসনিক কঠোরতার পথে হেঁটেছে, তেমনই বাড়িয়েছে আর্থিক বরাদ্দও।
বাজেট প্রস্তাবে জানানো হয়েছে, এতদিন প্রাথমিক স্তরের সরকারি স্কুলগুলিতে পড়ুয়া পিছু বরাদ্দ ছিল মাত্র ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। এবার থেকে রাজ্য সরকার সেই দৈনিক বরাদ্দ এক ধাক্কায় বাড়িয়ে করল ১০ টাকা। স্বাভাবিকভাবেই এই সিদ্ধান্তের ফলে খুদে পড়ুয়ারা আরও উন্নত মানের পুষ্টিকর খাবার পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনার শিকার হওয়া মিড-ডে মিলের রাঁধুনি এবং সহায়কদের মাসিক পারিশ্রমিকও এক ধাক্কায় ১,০০০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত মানবিক এবং ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ।
কলকাতার জন্য বিশেষ পাইলট প্রজেক্ট (Pilot Project)
বাজেট অধিবেশন শেষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বা পাইলট প্রজেক্ট (Pilot Project) হিসেবে প্রাথমিকভাবে সমগ্র কলকাতা (Kolkata) এলাকার দায়িত্ব তুলে দেওয়া হচ্ছে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ বা ইসকন (ISKCON)-এর হাতে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “রামকৃষ্ণ মিশন, গৌড়ীয় মঠ, ভারত সেবাশ্রম বা ইসকনের দেখানো পথে পশ্চিমবঙ্গ চলবে। আমরা ইসকনকেই মিড-ডে মিল খাবার সরবরাহ করার জন্য উদ্যোগ নিচ্ছি। পড়ুয়ারা সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও উন্নত মানের খাবার পাবে।” খাবারের গুণগত মান যাচাই নিয়ে কোনো সংশয় থাকলে, মুখ্যমন্ত্রীর সাফ বার্তা, “ইচ্ছা না থাকলে হরে কৃষ্ণ বলবেন না, কেউ জোর করবে না। কিন্তু খাবার ভালো পাবেন।”
‘ডিম-শঙ্কা’ ও পুষ্টির বিতর্ক
কিন্তু এই মহৎ উদ্যোগের আড়ালে যে প্রশ্নটি এখন কলকাতার অভিভাবক ও শিক্ষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে, তা হলো খাবারের পুষ্টির ভারসাম্য। বাংলার সরকারি স্কুলগুলিতে নিম্নবিত্ত বা সাধারণ পরিবারের বহু শিশুর কাছে মিড-ডে মিলের ডিমই ছিল একমাত্র সহজলভ্য প্রাণিজ প্রোটিন (Protein)। কিন্তু ইসকন (ISKCON) একটি সম্পূর্ণ নিরামিষাশী ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্থা হওয়ায় তাদের পরিবেশিত খাবারে কোনোভাবেই ডিম থাকবে না।
এরই মধ্যে ইসকনের সহ-সভাপতি রাধাবল্লভ দাস জানিয়েছেন যে তারা দিল্লি, গুজরাট বা মহারাষ্ট্রের মতো দেশের ৮টি রাজ্যে বিপুল সংখ্যক পড়ুয়াকে পুষ্টিকর খাবার পরিবেশন করেন। ডিমের বিকল্প হিসেবে সয়াবিন, পনির, বা বিভিন্ন পুষ্টিকর ডাল ও সবজি দিয়ে খাদ্যতালিকা বা মেনু (Menu) সাজানো হবে যাতে প্রোটিনের ঘাটতি না ঘটে। তবে শিক্ষামহলের একাংশের দাবি, প্রোটিনের বিকল্প খোঁজার পাশাপাশি পুষ্টির প্রশ্নে যেন কোনো আপস না করা হয়, সেদিকে স্কুল শিক্ষা দপ্তরকে (School Education Department) কড়া নজর রাখতে হবে। কলকাতার ঘিঞ্জি ট্রাফিক এবং ভৌগোলিক পরিকাঠামোর কথা মাথায় রেখে কীভাবে এই বিশাল পরিমাণ খাবার প্রতিদিন তাজা অবস্থায় স্কুলে স্কুলে পৌঁছাবে, তার চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করতে শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন (Dipak Barman)-এর দপ্তর ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে।


Recent Comments