বেআইনি পরিকাঠামো আর গাফিলতির চড়া মাশুল দিতে হলো আরও একবার। কলকাতা (Kolkata) শহরের বুকে ঘটে গেল এক ভয়াবহ বিপর্যয়। তারাতলা (Taratala) এলাকায় একটি নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ এবং লোহার কাঠামো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে তাসের ঘরের মতো ধসে গিয়েছে। এই ঘটনায় শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ জনে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় কলকাতার (Kolkata) এসএসকেএম (SSKM) ট্রমা কেয়ার সেন্টারে চিকিৎসাধীন রয়েছেন প্রায় ২০ জন শ্রমিক। ধ্বংসস্তূপের নিচে আর কেউ চাপা পড়ে রয়েছেন কিনা, তা নিশ্চিত করতে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বৃহস্পতিবার সকালেও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ (Rescue Operation) চালিয়ে যাচ্ছে।
ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলেন সংশ্লিষ্ট বিতর্কিত বহুতল গুদামের মালিক শম্ভুনাথ বেহেরা (Shambhunath Behera)। অবশেষে মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক (Track) করে বুধবার গভীর রাতে তারাতলা (Taratala) এলাকারই জেমস লং সরণির মানি টাওয়ারের একটি ফ্ল্যাট থেকে তাঁকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতের বিরুদ্ধে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু করা হয়েছে।
তদন্তে পুলিশের বড় সাফল্য: জালে ৫ অভিযুক্ত
দুর্ঘটনার তীব্রতা সামনে আসার পরেই নড়েচড়ে বসেছে লালবাজার এবং প্রশাসন। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বেআইনি ও ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণের অভিযোগে রাতভর তল্লাশি চালিয়ে মূল অভিযুক্ত ব্যবসায়ী শম্ভুনাথ বেহেরা (Shambhunath Behera) সহ মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ধৃতদের তালিকায় রয়েছেন:
- শম্ভুনাথ বেহেরা (Shambhunath Behera): ‘বেহেরা ব্রাদার্স’ সংস্থার মালিক ও গুদামের স্বত্বাধিকারী।
- মহম্মদ গুলজার হোসেন (Mohammad Gulzar Hossain): নির্মাণ সংস্থার অন-সাইট সুপারভাইজার (Supervisor)।
- কমল সামন্ত (Kamal Samanta): বিতর্কিত এই গুদামের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার (Structural Engineer)।
- দিবাকর ভাণ্ডারী (Diwakar Bhandari): শ্রমিক সরবরাহকারী বা লেবার সাপ্লায়ার (Labour Supplier)।
- আব্দুল হামিদ (Abdul Hamid): পুরসভার নকশা অনুমোদন করানোর নেপথ্যে থাকা মধ্যস্থতাকারী বা ব্রোকার (Broker)।
নকশায় গলদ! বাণিজ্যিক নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর
জানা গিয়েছে, কলকাতা (Kolkata) বন্দর কর্তৃপক্ষের থেকে লিজ (Lease) নেওয়া জমিতে এই বিশাল গুদামটি তৈরি করা হচ্ছিল। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, সাম্প্রতিক প্রবল বৃষ্টির জেরে ওই এলাকার মাটি অত্যন্ত নরম হয়ে গিয়েছিল এবং আলগা মাটির ওপর কোনো যথাযথ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছাড়াই এই ভারী লোহার কাঠামোটি দাঁড় করানো হচ্ছিল।
এই বিপর্যয় নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে কলকাতা পুরসভার (Kolkata Municipal Corporation) তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে নির্মীয়মাণ গুদামটির মূল নকশাতেই মারাত্মক ত্রুটি ছিল। চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি কীভাবে এই ত্রুটিপূর্ণ নকশা অনুমোদন পেল, তা খতিয়ে দেখতে কড়া তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি, দুর্ঘটনা এড়াতে ও সার্বিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে আপাতত কলকাতা পুরসভা এলাকার সমস্ত বাণিজ্যিক নির্মাণের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, দুর্ঘটনার ঠিক পরপরই শম্ভুনাথের মোবাইল লোকেশন মানি টাওয়ারে দেখাচ্ছিল। সেখানে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, ওই ভবনে তাঁর অফিস সহ ৬টি ফ্ল্যাট রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে সহযোগিতা না করলেও, পার্কিং লটে (Parking Lot) তাঁর সবকটি দামি গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পুলিশের সন্দেহ আরও বাড়ে। এরপর চালকদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তল্লাশি চালিয়ে শেষমেশ তাঁকে ধরে ফেলা হয়। এই ঘটনার নেপথ্যে বড় কোনো দুর্নীতির চক্র কাজ করছিল কিনা, তা জানতে ধৃতদের পুলিশি হেফাজতে নিয়ে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়েছে।


Recent Comments