আজ রবিবার, বাংলার ঘরে ঘরে উৎসবের আবহ। আলোর উৎসব দীপাবলি এবং শক্তির আরাধনা শ্যামাপুজোকে ঘিরে সেজে উঠেছে বাংলা। কোথাও মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি, কোথাও প্রতিমা দর্শনের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন ভক্তরা। সন্ধ্যা নামতেই জ্বলে উঠবে প্রদীপ, মোমবাতি ও আলোর মালা। অমাবস্যার ঘন অন্ধকারের বুক চিরে আলোর উৎসবের পাশাপাশি শুরু হবে মা কালীর আরাধনা।
বাংলার কালীপুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ইতিহাস, লোকাচার, বিশ্বাস, তন্ত্রসাধনা এবং বহু প্রাচীন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। দুর্গাপুজোর পর বাঙালির অন্যতম বড় উৎসব এই শ্যামাপুজো। তবে কালীপুজোর আগের দিন পালিত ভূত চতুর্দশী থেকে শুরু করে অমাবস্যার তিথি, চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানো কিংবা চোদ্দো শাক খাওয়ার রীতির মধ্যেও লুকিয়ে রয়েছে নানা интересesting তথ্য ও প্রচলিত বিশ্বাস।
কালীপুজো কেন অমাবস্যার রাতে হয়?
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথি মা কালীর আরাধনার জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেবী কালীকে শক্তি, সাহস, রক্ষা এবং অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাঁর কালো রূপ অসীম শক্তি ও মহাকালের প্রতীক। বিশ্বাস করা হয়, মা কালী ভক্তদের ভয়, অশুভ শক্তি ও অন্ধকার থেকে রক্ষা করেন।
অমাবস্যার রাতে যখন আকাশে চাঁদের আলো থাকে না, তখন চারদিকে নেমে আসে ঘন অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যেই প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক বার্তা—জীবনের সমস্ত অন্ধকার, ভয় ও অশুভকে জয় করে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়াই এই উৎসবের মূল তাৎপর্য।
বাংলায় কালীপুজোর প্রচলন কীভাবে শুরু হয়েছিল?
বাংলায় কালীপুজোর ইতিহাস বেশ প্রাচীন। তবে আজ যে দক্ষিণাকালী বা শ্যামা মূর্তির আরাধনা বাঙালির ঘরে ঘরে দেখা যায়, তার জনপ্রিয়তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ষোড়শ শতকের তন্ত্রসাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের নাম।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, নবদ্বীপের এই তন্ত্রসাধক স্বপ্নে দেবীর নির্দেশ পাওয়ার পর মায়ের একটি নির্দিষ্ট মূর্তির রূপ কল্পনা করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলায় গৃহস্থের মধ্যে প্রতিমায় কালীপুজোর প্রচলন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বলে মনে করা হয়। এর আগে অনেক ক্ষেত্রে ঘট, যন্ত্র কিংবা শিলাখণ্ডের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করা হতো। পরবর্তী সময়ে রাজা, জমিদার এবং বিভিন্ন পরিবারের উদ্যোগে কালীপুজো আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। Research News – The Indian Express +1
কালীপুজোর আগের দিন ভূত চতুর্দশী, কেন খাওয়া হয় চোদ্দো শাক?
কালীপুজোর আগের দিন অর্থাৎ ৭ নভেম্বর শনিবার পালিত হয়েছে ভূত চতুর্দশী। বাঙালির এই বিশেষ দিনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক প্রাচীন লোকাচার। এই দিন দুপুরে চোদ্দো রকমের শাক খাওয়ার রীতি রয়েছে। আর সন্ধ্যায় বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় জ্বালানো হয় চোদ্দোটি প্রদীপ।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ভূত চতুর্দশীর রাতে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের স্মরণ করা হয়। কথিত রয়েছে, বংশের চোদ্দো পুরুষের আত্মার উদ্দেশে তাঁদের বাড়ি ফেরার পথ আলোকিত করতেই জ্বালানো হয় চোদ্দো প্রদীপ। যদিও এটি ধর্মীয় লোকবিশ্বাস, এর কোনও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
অন্যদিকে, চোদ্দো শাক খাওয়ার রীতিও বাংলার সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঋতু পরিবর্তনের সময় নানা ধরনের শাকসবজি খাওয়ার সঙ্গে এই প্রথার সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রীতি আজও বাঙালির উৎসবের আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। Indian Express – Bangla +1
কখন শুরু হচ্ছে অমাবস্যা? কখন পুজোর শুভ সময়?
২০২৬ সালে ৮ নভেম্বর, রবিবার পালিত হচ্ছে কালীপুজো ও দীপাবলি। এবছর অমাবস্যা তিথি শুরু হয়েছে ৮ নভেম্বর সকাল ১১টা ২৭ মিনিটে। তিথি শেষ হবে ৯ নভেম্বর দুপুর ১২টা ৩১ মিনিটে।
পঞ্জিকা অনুযায়ী, কলকাতায় নিশীথকালে কালীপুজোর শুভ সময় রাত ১০টা ৫৫ মিনিট থেকে ১১টা ৪৬ মিনিট পর্যন্ত। অর্থাৎ, প্রায় ৫১ মিনিটের এই সময়কে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে স্থানীয় পঞ্জিকা ও স্থানভেদে সময়ের সামান্য পার্থক্য হতে পারে। Drikpanchang +1
মা কালীর রূপের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে কী বার্তা?
মা কালীর প্রতিমার প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই রয়েছে বিশেষ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্য। তাঁর গলায় মুণ্ডমালা, হাতে খড়্গ, রক্তাক্ত অসুরমুণ্ড এবং পদতলে শিব—এই প্রতিটি বিষয়কে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
দেবীর খড়্গ অশুভ ও অজ্ঞতার বিনাশের প্রতীক। মুণ্ডমালাকে অহংকার ও মানবজীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অন্যদিকে, দেবীর পদতলে শিবের অবস্থান নিয়েও রয়েছে নানা পৌরাণিক ব্যাখ্যা। প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, অসুরবিনাশের পর দেবীর ক্রোধ শান্ত করতে শিব তাঁর সামনে শুয়ে পড়েছিলেন। শিবের বুকে পা পড়তেই দেবী নিজের জিভ বের করে লজ্জিত হন।
এই কারণেই বাঙালির কাছে মা কালী শুধু ভয়ংকরী দেবী নন, তিনি একই সঙ্গে মমতাময়ী মাতৃশক্তির প্রতীক।
দীপাবলি ও কালীপুজো কি একই উৎসব?
একই দিনে পালিত হলেও দীপাবলি ও কালীপুজোর ধর্মীয় তাৎপর্য এক নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দীপাবলিতে মূলত দেবী লক্ষ্মী ও গণেশের আরাধনা করা হয়। কোথাও আবার ভগবান রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের স্মৃতিতে দীপাবলি উদ্যাপন করা হয়।
কিন্তু বাংলায় কার্তিক অমাবস্যার রাতে বিশেষ গুরুত্ব পায় মা কালীর আরাধনা। তাই এই দিনটি শ্যামাপুজো নামেও পরিচিত। তবে বাংলাতেও বহু পরিবারে লক্ষ্মীপুজো ও দীপাবলির অন্যান্য রীতি পালিত হয়। একই উৎসবের মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই ভারতীয় ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। Research News – The Indian Express +1
বাংলার কালীপুজো মানেই আলোর উৎসব, ভক্তি আর মিলন
কালীপুজোকে কেন্দ্র করে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বসেছে অসংখ্য পুজোর আসর। দক্ষিণেশ্বর, কালীঘাট, তারাপীঠ থেকে শুরু করে নবদ্বীপ, নৈহাটি—বিভিন্ন ঐতিহাসিক মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় থিমের মণ্ডপ, আলোকসজ্জা এবং প্রতিমা দর্শনকে কেন্দ্র করে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। Akashvani News
কোথাও ভক্তরা রাত জেগে মায়ের আরাধনা করবেন, কোথাও আবার পরিবারের সকলকে নিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে দীপাবলি উদ্যাপন করবেন। আতসবাজির আলো, মণ্ডপের সাজসজ্জা, ধূপ-ধুনোর গন্ধ আর মায়ের মন্ত্রোচ্চারণে মুখর হয়ে উঠবে চারপাশ।
সব মিলিয়ে কালীপুজো শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য, আবেগ ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অমাবস্যার ঘন অন্ধকারে প্রদীপের ছোট্ট শিখা যেমন আলো ছড়ায়, তেমনই মা কালীর আরাধনার মধ্য দিয়ে মানুষের মনে জাগে নতুন আশা, সাহস ও শক্তির বার্তা। অশুভের বিনাশ হোক, শুভ শক্তির জয় হোক—এই প্রার্থনাতেই আজ মেতে উঠেছে বাংলা।


Recent Comments