Sharanya Ghosh: ধন-সম্পদ, সুখ-সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের কামনায় লক্ষ্মীপুজোর প্রচলন বাঙালি ঘরে ঘরে। কিন্তু লক্ষ্মীকে বরণ করার পাশাপাশি বহু বাঙালি পরিবারে রয়েছে আরও এক প্রাচীন লোকাচার—‘অলক্ষ্মী বিদায়’। বিশ্বাস, সংসার থেকে অশুভ শক্তি, দারিদ্র্য, অশান্তি ও নেতিবাচকতা দূর করতেই এই বিশেষ আচার পালন করা হয়।
বছরের পর বছর ধরে বাংলার বিভিন্ন পরিবারে লোকবিশ্বাস ও পারিবারিক প্রথা মেনে এই রীতি চলে আসছে। কোথাও কুলো পিটিয়ে, কোথাও বিকট শব্দ করে, আবার কোথাও বিশেষ খাবার নিবেদন করে প্রতীকীভাবে বিদায় জানানো হয় অলক্ষ্মীকে।
কে এই অলক্ষ্মী? কী বলছে পুরাণ?
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, সমুদ্র মন্থনের সময় দেবী লক্ষ্মীর আবির্ভাবের আগে তাঁর জ্যেষ্ঠা ভগিনী অলক্ষ্মীর আবির্ভাব হয়েছিল। লোকবিশ্বাসে অলক্ষ্মী হলেন দুর্ভাগ্য, দারিদ্র্য, অশান্তি, ঈর্ষা ও অমঙ্গলের প্রতীক। অন্যদিকে দেবী লক্ষ্মী সুখ, শান্তি, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, যে সংসারে অপরিচ্ছন্নতা, অলসতা, অহংকার ও পারিবারিক বিবাদ থাকে, সেখানে অলক্ষ্মীর বাস। তাই লক্ষ্মীকে ঘরে আমন্ত্রণ জানানোর আগে অলক্ষ্মীকে বিদায় জানানোর রীতি প্রচলিত হয়েছে।
কীভাবে পালন করা হয় অলক্ষ্মী বিদায়?
দীপান্বিতা অমাবস্যার সন্ধ্যায় বাড়ির উঠোনে বা কোনও নির্দিষ্ট স্থানে গোবর দিয়ে অলক্ষ্মীর প্রতীকী পুতুল তৈরি করা হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, এই পুজোয় ডান হাতের পরিবর্তে বাঁ হাত ব্যবহার করা হয়। অলক্ষ্মীর উদ্দেশে নিবেদন করা হয় তেঁতুল, শুকনো মুড়কি এবং বিভিন্ন তিতকুটে খাবার।
এরপর শুরু হয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব। পুরনো বা ভাঙা কুলো নিয়ে কাঠি দিয়ে পেটাতে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। সেই বিকট শব্দের সঙ্গে উচ্চারণ করা হয়—
‘অলক্ষ্মী দূর দূর, লক্ষ্মী আয় ঘরে।’
এরপর কুলোয় করে অলক্ষ্মীর প্রতীকী পুতুল বাড়ির সীমানার বাইরে, রাস্তার মোড়ে কিংবা কোনও নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসা হয়। কোথাও কোথাও কুলো ভেঙে ফেলারও রীতি রয়েছে।
অলক্ষ্মী বিদায়ের পরেই লক্ষ্মীবরণ
অলক্ষ্মীকে বিদায় জানিয়ে বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্যরা হাত-পা ধুয়ে শুদ্ধ হন। কোথাও গঙ্গাজল ছিটিয়ে ঘরে প্রবেশ করার রীতিও রয়েছে। এরপর বাড়িতে আলপনা দেওয়া হয়, প্রদীপ জ্বালানো হয় এবং দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা শুরু হয়।
আজও কেন বেঁচে রয়েছে এই প্রাচীন প্রথা?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক আচার-অনুষ্ঠানের পরিবর্তন ঘটলেও বাংলার কিছু পরিবারে আজও এই ঐতিহ্য বজায় রয়েছে। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের এদেশীয় বা ঘটি পরিবারগুলির মধ্যে এই রীতির প্রচলন দেখা যায়। যদিও বর্তমানে সব পরিবারে এই প্রথা পালিত হয় না।
আসলে অলক্ষ্মী বিদায় শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে একটি সামাজিক বার্তাও। সংসার থেকে অশান্তি, হিংসা, অপরিচ্ছন্নতা ও নেতিবাচকতা দূর করে সুখ-শান্তি এবং সমৃদ্ধিকে স্বাগত জানানোর প্রতীক এই প্রথা।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলেছে জীবনযাত্রা, বদলেছে উৎসব পালনের ধরন। তবুও বাংলার এই প্রাচীন লোকাচার আজও মনে করিয়ে দেয়—ঐতিহ্য শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা সংস্কৃতির পরিচয়।

Recent Comments