অশোক সেনগুপ্ত
সোমবার অনেকে সকালবেলায় টানটান উত্তেজনা নিয়ে বসে গিয়েছিলেন ছোটপর্দার সামনে। না বসে করবেনই বা কী? কে জিতবে, কে হারবে— এত কৌতূহল চেপে রাখবেনই বা কেন? তাঁরা অনেকে দেখলেন কিছু গণনাকেন্দ্রর সামনে আমি উড়ছি। কিন্তু ওই পর্যন্তই! আমাকে নিয়ে খুব একটা আগ্রহ কেউ দেখালেন না!
দুঃখ হয় বৈ কি! নেতা-নেত্রীদের কুষ্ঠিবিচার, তাঁদের কটা বিয়ে, কত টাকা, কতবার পুলিশি অভিযুক্ত হিসাবে দণ্ডিত হয়েছেন, নির্বাচন কমিশন কত মন্দ এবং কেন— এ সব লিখে লিখে সাংবাদিকরা হদ্দ হয়ে গেলেন। ইভিএম, ভিভিপ্যাট, ভোটযন্ত্রের কন্ট্রোল প্যানেল নিয়ে অনেক বিতর্ক-লেখালেখি হয়েছে। শেষবেলায় বহু লোকের কানে কানে ঘুরল স্ট্রংরুম কথাটা। কবে থেকে লেখালেখি, আলোচনা হচ্ছে আধা সামরিক ফৌজের বহর, আপৎকালীন বাহিনী (কিউ আর টি), নজরদার সিসি ক্যামেরা নিয়ে। কিন্তু আমি যেন ব্রাত্য! আমার মতো কত নজরদারকে পশ্চিমবঙ্গ-সহ চার রাজ্যের গণনায় খাটছে, তা নিয়ে কারও হেলদোল নেই। তাহলে দুঃখ হবে না কেন, বলুন!
জানেন, আমার প্রয়াত পূর্বপুরুষদের জন্ম প্রায় ৯০ বছর আগে! আমরা তো খুব একটা দীর্ঘায়ু হই না! নতুন প্রযুক্তি এসে প্রায় মেরে দেয় পুরনোগুলোকে। এই ‘ড্রোন’-এর সঙ্গে কিন্তু পুরাণের ঋষি দ্রোন (দ্রোনাচার্য) -এর কোনও সম্পর্ক নেই! ‘ড্রোন’ শব্দটি প্রাচীন ইংরেজি ‘drān’ বা ‘dræn’ থেকে উদ্ভূত, যা পুরুষ মৌমাছিকে বোঝাত। এটি সম্ভবত একটি প্রোটো-জার্মানিক শব্দ থেকে এসেছে যা পোকামাকড়ের গুঞ্জন শব্দের অনুকরণ করত।
১৫০০-এর দশকের ‘ড্রোন’ বলতে বোঝাতো
একজন ‘অলস ব্যক্তি’। বা, নিষ্কর্মার ঢেঁকি! ১৯৩০-এর দশকের মধ্যে, কথাটি চালকবিহীন, রেডিও-নিয়ন্ত্রিত বিমানের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। পোকামাকড়ের উৎস (প্রাচীন ইংরেজি): ‘drān’ শব্দটি পুরুষ মৌমাছিকে বোঝাত। ওগুলো কাজ করে না, নিচু, গুঞ্জন শব্দ তৈরি করে মধু খাওয়াই যেন ওর কাজ।
যাঁরা শব্দচর্চা করেন, তাঁদের মতে ষোড়শ শতাব্দীতে অন্যের শ্রমে জীবনযাপনকারীদের
রূপক অর্থে বলতেন ‘ড্রোন’। ‘ল্যাঙ্গুয়েজ লগ’ অনুসারে, শব্দটির অর্থ অলস মানুষ, যা পুরুষ মৌমাছির আচরণের প্রতিচ্ছবি ছিল।
কেউ কেউ মনে করেন, শব্দটি কেবল এই কারণেই ব্যবহৃত হয়েছিল। তারপর সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ শব্দটি ইংরেজি ভাষায় ‘ড্রোন’ কথাটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
গত শতকের ত্রিশের দশকের মাঝপর্বে চালকবিহীন বিমানকে অনেকে বলতেন ‘ড্রোন’। যেগুলোর মধ্যে ১৯৩৫ সালে নাম করেছিল ব্রিটিশ DH.82B কুইন বি টার্গেট। বিমানের ‘বিবেকহীন’, একঘেয়ে, এবং যন্ত্রগুলোর গুঞ্জনময় প্রকৃতির জন্য এরকম নাম। প্রাথমিক রেডিও-নিয়ন্ত্রিত, চালকবিহীন লক্ষ্যবস্তুগুলো ‘ড্রোন’-এর মতো পূর্বনির্ধারিত পথে চলত।
প্রতিযোগিতার বাজারে যে যার মতো উন্নতির চেষ্টা করছে! আমাদেরও মনিবরা উন্নত মস্তিষ্ক ও আরও বেশি চক্ষুস্মান করার চেষ্টা করছেন।
ড্রোনকে প্রধানত গঠন অনুসারে ‘মাল্টি-রোটর’, ‘ফিক্সড-উইং’, ‘সিঙ্গেল-রোটর’ এবং ‘হাইব্রিড’ প্রকারে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়। মাল্টি-রোটর ড্রোন (যেমন ‘কোয়াডকপ্টার’) স্থিরভাবে ভেসে থাকে। ছবি তোলার জন্য এগুলো আদর্শ। অন্যদিকে ‘ফিক্সড-উইং ড্রোন’ মানচিত্র তৈরির জন্য দীর্ঘ পরিষেবা দেয়। ‘হাইব্রিড ভিটিওএল ড্রোন’ উল্লম্বভাবে ওড়ার সাথে দক্ষ ও দীর্ঘ-দূরত্বের ডানাযুক্ত উড়ানের সমন্বয় ঘটায়।
এই যে নির্বাচন কমিশন পাখির চোখে দেখা বিভিন্ন ছবি পেশ করছে, সেগুলোতেও কিন্তু আমাদের, মানে ড্রোন-এর তোলা ছবি আছে! গতকাল রবিবার থেকেই নজরদারির জন্য ড্রোন নামানো হয়েছে বিভিন্ন গণনাকেন্দ্রের সামনে। ওপর থেকে একটা খুব হালকা গোঁওও শব্দ করে লক্ষ্য করছি, ছবিতে ধরে রাখছি সব কিছু!
তা, দাম হয় এক একটা ড্রোনের? তা নির্ভর করে কী কাজে, কোন গোত্রের ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে, তার ওপর। ইস্রায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল হিজবুল্লাদের ড্রোন। সক্ষমতা, পিক্সেল পিচ, রেজোলিউশন, ক্যাপাসিটি, ইউসেজ— এসবের ওপর। আর বোঝেনই তো! পাত্রী দেখানোর আসরে তাঁর গুণাবলীর ফিরিস্তি দিতে কত কসরৎ করা হয়! তেমনই যদি বলা হয় ‘হাই ব্রাইটনেস এলইডি প্যানেল’, ‘জিপিএস এনাবেলড প্রিসিসন ফ্লাইং’— এরকম নানা সুযোগ আছে ড্রোনে, তাহলে বিক্রেতা একটু বেশি হাঁকবেই!
সবশেষে বলি, আমি কিন্তু সর্বঘটে কাঁঠালি কলা! যাকে বলে ‘রাজদ্বারে শ্মশানে বন্ধু’! মানে, সিনেমার শুটিংয়ে, উৎসবে, বিপদে, স্বাস্থ্যপরিষেবায়, নির্বাচনের প্রচার ও ফলাফল ঘোষণায়, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে— সর্বত্রই আছি ড্রোনেরা!


Recent Comments