ভোটের আর মাত্র ১২ ঘণ্টা বাকি। চারদিকে চরম ব্যস্ততা, বুথে বুথে ইভিএম নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন ভোটকর্মীরা। ঠিক এমন এক টানটান উত্তেজনার মুহূর্তেই বেনজির পদক্ষেপ নিল ভারতের নির্বাচন কমিশন (Election Commission)। কড়া হাতে নির্বাচনী রাশ টানতে এবার সরাসরি সরিয়ে দেওয়া হল ফলতা (Falta) ব্লকের জয়েন্ট বিডিও (Joint BDO) বা যুগ্ম সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিককে। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর— তিনি নাকি এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং ‘সিংঘম’ (Singham) হিসেবে পরিচিত দুঁদে পুলিশ আধিকারিক অজয়ের (Ajay) কাজে চূড়ান্ত অসহযোগিতা করছিলেন। এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই রাজ্য রাজনীতি তথা প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে।
অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করানোই এখন কমিশনের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ (West Bengal) রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগনা (South 24 Parganas) জেলার এই অঞ্চলটি রাজনৈতিকভাবে বরাবরই অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিতেই কমিশন বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিল দাপুটে পুলিশ অফিসার অজয়কে। অপরাধীদের কাছে তিনি মূর্তিমান আতঙ্ক এবং নিজের কর্তব্যপরায়ণতার জন্য সাধারণ মানুষের কাছে তিনি ‘সিংঘম’ নামেই অধিক পরিচিত। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল এলাকায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঠিক রুটমার্চ করানো, দাগী আসামীদের চিহ্নিত করা এবং ভোটের দিন যেকোনো ধরনের গন্ডগোল কড়া হাতে দমন করা।
কিন্তু অভিযোগ ওঠে, ফলতার ওই জয়েন্ট বিডিও এই স্পর্শকাতর কাজে পুলিশ আধিকারিককে কোনোভাবেই সাহায্য করছিলেন না। নিয়ম অনুযায়ী, ভোটের সময় স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে লজিস্টিক সাপোর্ট, এলাকার নিখুঁত ম্যাপ, এবং উত্তেজনাপ্রবণ বুথগুলির সঠিক তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ওই প্রশাসনিক কর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তথ্য গোপন করছিলেন, বাহিনীর জওয়ানদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থায় গাফিলতি করছিলেন এবং সর্বোপরি আধিকারিক অজয়ের কোনো নির্দেশিকাই পালন করছিলেন না। এমনকী, বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও তাঁর আচরণে বা কাজের ধরনে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি।
ভোটের ঠিক আগের রাতে এই ধরনের অসহযোগিতা যে কোনো বড়সড় নিরাপত্তার ফাঁক তৈরি করতে পারে, তা বুঝতে পেরে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেননি ওই পুলিশ অফিসার। তিনি সরাসরি দিল্লির (Delhi) নির্বাচন সদনে রিপোর্ট পাঠান। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে কমিশনও কালবিলম্ব করেনি। রাতেই কড়া নির্দেশিকা জারি করে অবিলম্বে ওই জয়েন্ট বিডিওকে তাঁর ভোটের যাবতীয় দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাঁর জায়গায় অন্য এক আধিকারিককে তড়িঘড়ি দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে আগামীকালের ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক স্তরে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে।
প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, কমিশনের এই পদক্ষেপ আসলে রাজ্যের সমস্ত আধিকারিকদের জন্য একটি কড়া বার্তা। ভোটের ডিউটিতে থাকা রাজ্যের কোনো সরকারি কর্মচারী যদি পক্ষপাতিত্ব করেন বা কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পর্যবেক্ষকদের কাজে বাধা সৃষ্টি করেন, তবে কমিশন যে কাউকে রেয়াত করবে না, তা এই ঘটনা থেকে জলের মতো স্পষ্ট। ফলতা এলাকার সাধারণ মানুষও কমিশনের এই তড়িৎ পদক্ষেপে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করছেন, প্রশাসন এবং পুলিশের মধ্যে সঠিক সমন্বয় থাকলেই তবে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।


Recent Comments