প্রাককথন— ”…— এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয় — হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে;
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে।”
কেমন আছে বরিশালের কবি জীবনানন্দ দাসের ধানসিঁড়ি নদী? প্রয়াত কবির জন্মদিনের প্রাক্কালে নিউজস্কোপের তরফে অশোক সেনগুপ্ত সেই উত্তর খোঁজার অনুরোধ করেন বরিশালের সাংবাদিক কমল সেনগুপ্তকে। কবি জীবনানন্দের এই আকুতির উৎস বাস্তবে প্রায় বিলীন। বিশাল চরের গ্রাসে নদীর বুক। বাংলাদেশের ঝালকাঠির সেই ধানসিঁড়ি নদী শীতকালে শুকিয়ে শীর্ণ হয়ে যায়। পূর্ণ গর্ভের বদলে জল তার হাঁটু সমান। এমনকী হেঁটে পার হওয়া যায়। জীবনানন্দ দাশের প্রিয় ধানসিঁড়ি নদীটির আজ এমনই অবস্থা।
১৮৯৯-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি জন্ম হয়েছিল জীবনানন্দ দাসের।
ধানসিঁড়ি নদী কি আজ নিছকই স্মৃতিমেদুরতা
কমল সেনগুপ্ত
কবি জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় ধানসিঁড়ি নদীকে বারবার ব্যবহার করেছেন— কখনো সরাসরি নাম ধরে, কখনো স্মৃতির ভেতর দিয়ে। ধানসিঁড়ি নদী কি আজ বাস্তব জীবনে ততটা সক্রিয় নয়, শুধু স্মৃতির ভেতরেই বেঁচে আছে? কবি জীবনানন্দ দাশের সেই কাব্যময় পংক্তিগুলো—আজও কি বরিশালের মানুষের হৃদয়ে আগের মতো ঢেউ তোলে, না কি সেগুলোও কেবল পাঠ্যবই আর স্মৃতিচারণায় আটকে আছে? এ প্রশ্ন করেছিলাম বরিশালের কয়েজন কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, গবেষককে।
কবি, সাহিত্যিক ও বর্ষীয়ান সাংবাদিক অরূপ তালুকদার বলেন, প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ। তাঁর কবিতার সেই ধানসিঁড়ি নদীর স্মৃতি এখন শুধু বাঙ্গালীদের নয় বরং যতদিন যাচ্ছে ততই যেন বিশ্বজুড়ে থাকা সকল বাংলাভাষী ও কবিতাপ্রেমি মানুষের মনোলোক আলোড়িত করে নতুন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক, জীবনানন্দ দাশ রিসার্চ সেন্টারের সাবেক পরিচালক, গবেষক মুহম্মদ মুহসিন বলেন, “ধানসিঁড়ি নদীর বর্তমান অস্তিত্ব ও বর্তমান প্রজন্মের মানুষের সাথে এর সম্পর্ককে নিছক ‘স্মৃতিমেদুরতা’ দ্বারা বর্ণনা করা যায় না বলে আমি মনে করি। নদী ধানসিঁড়ি বাংলার ইতিহাস ভূগোলে কোনোকালেই ব্যাপক প্রভাবশালী কোনো নদীরূপে অস্তিত্ব ছিল না। নদীটির আদি নাম ছিল ধানসিদ্ধ। সেকালের আরএস এবং সিএস মৌজাম্যাপে ইংরেজি বানানে এর নাম Dhansidda এখনো ইচ্ছে করলে দেখে নেয়া যায়।
জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি হলো শিলচর থেকে মেদিনীপুর পর্যন্ত, শিলিগুড়ি থেকে সেন্ট মার্টিন্স পর্যন্ত বিস্তৃত, বাঙাল ভূখণ্ডের কোটি কোটি মানুষের জীবনানুভবের কাব্যিকতার এক প্রবহমান জলধারা, এক প্রবহমান অনুভবধারা। সেই অনুভবধারা জীবনানন্দের পংক্তি ধরে চিরকাল আলোড়িত করবে এই বঙ্গের সকল জীবনকে।”
মুহম্মদ মুহসিন তাঁর দীর্ঘ গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে বলেন, “বিংশ শতকের গোড়ার দিকে তৎকালীন ‘বেঙ্গল সেন্ট্রাল ফ্লোটিলা কোম্পানি’ কিংবা ‘রিভার স্টিম’ কোম্পানির বরিশাল-কোলকাতা স্টিমারগুলো ঝালকাঠির সুগন্ধা পার হয়ে মাত্র ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ছোট্ট এই নদীটিতে ঢুকতো। অত্যন্ত অপ্রশস্ত এই নদীর দুই পাড়ের গ্রামীণ গৃহস্থঘরগুলোর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ও কন্যাবধূদের প্রতিদিনকার জীবনচিত্র অত্যন্ত আপন আঙ্গিকে ভেসে উঠতো স্টিমারের ডেকে বসা চলমান যাত্রীদের চোখে।
সেই জীবনছবির উদ্দীপনায়ই হয়তো জীবনানন্দের কবিমানসে ছোট্ট নদীটি জাগিয়েছিল এক অমর কবি কল্পনা। সেই কল্পনার সৃজনে নদীটি অবশ্য ধানসিদ্ধ হয়ে থাকতো পারলো না। কারণ, কবিতার লালিত্য এর ধ্বনিব্যঞ্জনায় ছিল না। তাই কবিমানসের জাদুকরী শিল্পশক্তিতে নামটি রূপান্তরিত হলো ধানসিঁড়িতে। ফলে ধানসিঁড়ি অর্ধেক বাস্তব আর অর্ধেক কল্পনার এক মায়াময় রূপ। বাঙালির কাব্যানুভবের জীবনায়নে তাই ধানসিঁড়ির শক্তি চিরকাল জুড়ে ক্ষান্তিহীন, শ্রান্তিহীন এবং চির অমলিন। ভূগোলের ধানসিঁড়ির অস্তিত্ব ও অবস্থা, জৌলুসময়তা বা জৌলুসহীনতা, জলপ্রবাহের হীনতা বা ক্ষীণতা এখানে কোনোই গুরুত্ব বহন করে না। এমনটাই আমরা এখানকার জীবনানন্দের পাঠক ও গবেষকরা মনে করি।”
প্রগতি লেখক সংঘ, বরিশাল শাখার সভাপতি অধ্যাপিকা হাসিনা বেগম বলেন, “আমার ধারনা কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় ধানসিঁড়ি নিয়ে যে কাব্যময় পঙ্কতিগুলো রয়েছে তা বরিশালের প্রত্যেক কবি, সাহিত্যিক, গবেষক অধ্যাপকদের আজও আলোড়িত করে। আমি রসায়নের অধ্যাপক হয়েও বাংলা সাহিত্যের একজন সামান্য অনুরাগী মাত্র। সামান্য কাব্যচর্চা করি,তাই ধানসিঁড়ি আমার মনের গহীনে এক গোপন ভালোবাসার,আবেগের স্থান যা আমাকে আলোড়িত করে।”
বরিশালের বিশিষ্ট কবি ও শিক্ষাবিদ আসমা চৌধুরী সাবলীল ভাবে বলেন, “জীবনানন্দ আজ আর অচেনা কোনো কবি নয়। কবিতা ভালোবাসা মানুষের মানসিক আশ্রয় ধানসিঁড়ি। অনেকেই মনে করেন বরিশাল মানে জীবনানন্দ, জীবনানন্দ মানে ধানসিঁড়ি।একথাও বলা যায় ধানসিঁড়ি যেন প্রকৃতি ছাড়িয়ে কবির কবিতার সেই অমোঘ দেশপ্রেম। যদিও বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কারণে ক্ষয় জমেছে শিশিরের টুপটাপ ফোঁটার মতো ভেতরে, বাইরে। তবু কবিতার পাশাপাশি কিছু মানুষ নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে জেগে ওঠার, এই যাত্রায় জীবনানন্দ তাদের সঙ্গী। ধানসিঁড়ি একটি অঙ্গ। ধানসিঁড়ি অবশ্যই আলোড়িত করে। দূর থেকে আসা মানুষদের প্রথম প্রশ্ন ধানসিঁড়ি নদীটি কোথায়? যেতে চাই তার কাছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সাবেক কালচালার অফিসার, লেখক বাহাউদ্দিন গোলাপ জানান, ধানসিঁড়ি আজ আর কেবল কোনো মানচিত্রের জলরেখা নয়, বরং তা বাঙালির অস্তিত্বের গভীরে বহমান এক অতীন্দ্রিয় বিষাদ। কবির সেই মায়াবী পঙক্তিগুলো আজও আমাদের অবচেতনে এক অলৌকিক হাহাকার জাগিয়ে তোলে, যা প্রমাণ করে যে মানুষ আদতে তার হারানো সৌন্দর্যের কাছেই আজন্ম ঋণী। আমাদের সমষ্টিগত ভাবনায় ধানসিঁড়ি তাই নিছক এক স্মৃতিমেদুরতা নয়; বরং তা এক মৃত্যুঞ্জয়ী নস্টালজিয়া।
অধ্যাপিকা টুনু রানী কর্মকার জানান, “ধানসিঁড়ি ছিল জীবন্ত উচ্চারণ। তার ঢেউয়ে ঢেউয়ে ছিল গান, তার তীরে তীরে ছিল কৃষকের ঘাম, জেলের স্বপ্ন, কবির ভাষা। জীবনানন্দ দাশ যে ধানসিঁড়ির কথা লিখেছিলেন, তা শুধু একটি নদীর নাম নয়—ওটা ছিল গ্রামবাংলার নিঃশ্বাস, নিঃশব্দ অথচ গভীর এক জীবনবোধ। কারণ নদী শুধু জলধারা নয়—নদী হলো সংস্কৃতি”।





গবেষক ও সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ বলেন, “এক সময় ধানসিঁড়ি নদীর নাম ছিল ধানসিদ্ধ নদী। নাম দিয়ে বোঝা যায় -নদীর তীরে যে বিপুল পরিমাণ ধানের ফলন হতো,তা-সিদ্ধ করা থেকেই এই নামটি এসেছে। জীবনানন্দ দাশ প্রথমে, ধানসিদ্ধ নদীটিকে ধানসিঁড়ি নামে সম্বোধন করেন। নদীটিকে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ, নদীর মতন মনে করেন না -কেননা নদীর যে বিশালতা -সেটি ধানসিঁড়ি নদীতে প্রায় অনুপস্থিত। তবে আশ্চর্য, ব্রিটিশ আমলে এই অপ্রশস্ত নদী দিয়ে, খুলনাগামী স্টিমার চলতো। যাই হোক কবি, এই স্টিমারে চলাচল করতেন -এবং ধানসিঁড়ির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতেন। এসব সৌন্দর্য কবিকে এই বাংলায় আবার ফিরে আসতে বাধ্য করে।”
কবি অপূর্ব গৌতমের কথা শুনে মোহিত হয়ে গেলাম। তিনি জানান, ১৯৯৯ সালে আমি ধানসিঁড়ি নদীতে স্নান করেছি। আমি নদীকে পেয়েছি, আমি জলকে পেয়েছি, আমি জীবনানন্দকে পেয়েছি। অতঃপর এক বোতল জল নদী থেকে নিয়ে এসেছি। দীর্ঘ ২৭টি বছর অতি যত্নে চোখের সামনে রেখেছি ধানসিঁড়ি নদীর জলভর্তি বোতলটি। ঘরে বসেই অনুভব করছি – আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি নদী তীরে।”
বরিশালের জীবনানন্দপ্রেমী মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেল—ধানসিঁড়ির জল আজ হয়তো আগের মতো প্রবল নয়, তবু মানুষের হৃদয়ে তার স্রোত এখনো অবিরাম বহমান। বরিশালের জীবনানন্দপ্রেমীদের কাছে ধানসিঁড়ি কেবল জলে সীমাবদ্ধ নয়—সে কবিতার ভাষায়, অনুভূতির গভীরে আর ছন্দের নিঃশব্দ ঢেউয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল।

