বকুল শ্রীমানী
সাংবাদিকতার ইতিহাসের দিকে চোখ রাখলে আমরা দেখব যে, প্রতিটি যুগান্তকারী পরিবর্তনই এসেছিল প্রযুক্তির হাত ধরে। গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র যেমন সংবাদকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল, তেমনি, রেডিও এবং টেলিভিশন মুদ্রিত অক্ষরের সীমাবদ্ধতাকে ভেঙে সরাসরি কণ্ঠ ও চিত্রের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিল।
এই পরিবর্তনের পথ ধরেই এসেছে ডিজিটাল প্রযুক্তি, যা আজ সাংবাদিকতার মৌলিক কাঠামোকে বিবর্তিত করে জন্ম দিচ্ছে নতুন ধারার। কিন্তু এই পরিবর্তন শুধু মাধ্যমের নয়, এ পরিবর্তন সংবাদ রচনা ও পরিবেশন পদ্ধতির, সাংবাদিকতার দর্শনের, এমনকি নীতিগত দায়বদ্ধতারও। আমরা আজ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন প্রতিটি নাগরিকই সম্ভাব্য সাংবাদিক। ডিজিটাল মিডিয়ার দুনিয়ায় সংবাদ সহ আরো অন্যান্য বিষয়বস্তুর নির্মাণ বা কন্টেন্ট ক্রিয়েশন, সৃজনশীল অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখছে।
ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে সংবাদ উৎপাদন ও বিতরণের একচেটিয়া ক্ষমতা আর কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে অথবা প্রশিক্ষিত সাংবাদিকদের কাজের পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাই হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনই আজ সম্পূর্ণ একটা নিউজরুম। সমাজ মাধ্যমের পোস্ট হয়ে উঠেছে সংবাদ প্রতিবেদনের উপজীব্য।
এই প্রেক্ষাপটে “ডিজিটাল সাংবাদিকতা: পরিপ্রেক্ষিত ও পর্যালোচনা” বইটি একটি সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। প্রকাশক সোম পাবলিশিং। বইটি ডিজিটাল ও মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তির সাম্প্রতিক অগ্রগতির আলোকে সাংবাদিকতার নতুন কর্মপদ্ধতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহার, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জগুলোকে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে।
বইটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। এতে শুধু তাত্ত্বিক আলোচনাই নয়, ডিজিটাল মাধ্যমে সংবাদের ভাষা কেমন হওয়া উচিত, কীভাবে সৃজনশীল ও প্রাণবন্ত প্রতিবেদন তৈরি করে পাঠকের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া যায়, AI কি সত্যিই সাংবাদিকতাকে আমূল বদলে দেবে, স্বাধীন সাংবাদিকদের জন্য নতুন পথ খুলবে কি না, এবং ডিজিটাল মাধ্যম কি টেকসই আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে—এসব প্রশ্নের যুক্তিপূর্ণ উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে।
সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের জন্য এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যবই ও সহায়িকা। যারা আগামী দিনে ডিজিটাল সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চান অথবা যারা কর্মরত সাংবাদিক, শিক্ষক ও গবেষক – তাদের প্রত্যেকের জন্য এই বই একটা নির্ভরযোগ্য মানচিত্রের মতো কাজ করবে।
মোটের ওপর, অধ্যাপিকা বকুল শ্রীমানীর লেখা ‘ডিজিটাল সাংবাদিকতা: পরিপ্রেক্ষিত ও পর্যালোচনা’ বইটি শুধু একটি সিলেবাস নির্ভর পাঠ্যবই নয়, বরং ডিজিটাল যুগের সাংবাদিকতার দিকনির্দেশক। যারা এই দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল সাংবাদিকতার দুনিয়ায় পা রাখতে চান বা বুঝতে চান কীভাবে প্রযুক্তি সাংবাদিকতাকে বিবর্তিত করছে, তাদের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য।
