বাঙালি পাঠকদের হৃদয়ে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রাজত্ব করেছেন তিনি। তাঁর কলম দিয়ে উঠে এসেছে কলকাতার অলিগলি থেকে শুরু করে হোটেলের অন্দরের অজানা সব আখ্যান। শুক্রবার রাতে বাংলার সাহিত্য জগৎ এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হল। চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হলেন প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক মণি শংকর মুখোপাধ্যায় (Mani Shankar Mukherjee), যিনি পাঠকমহলে কেবল ‘শংকর’ (Sankar) নামেই অতি পরিচিত ছিলেন।
মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন এই প্রবীণ লেখক। সম্প্রতি তাঁকে কলকাতা (Kolkata) শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। শুক্রবার সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে জীবনের শেষ যাত্রাতেও তিনি বজায় রাখলেন তাঁর চিরচেনা সাদামাটা স্বভাব। পরিবারের সদস্যদের কাছে তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল, কোনো প্রকার আড়ম্বর ছাড়াই যেন তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। সেই অনুরোধ মেনেই শুক্রবার রাতে কলকাতার কেওড়াতলা (Keoratala) মহাশ্মশানে অত্যন্ত নিরিবিলিতে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
শোকবার্তা প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর
সাহিত্যিকের প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে রাজনৈতিক থেকে সাংস্কৃতিক—সব মহলেই। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) তাঁর X (পূর্বতন Twitter) হ্যান্ডেলে গভীর শোক প্রকাশ করে লিখেছেন, “শ্রী মণি শংকর মুখোপাধ্যায় ওরফে শংকরের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন মহীরূহ ছিলেন, যাঁর লেখনীতে সাধারণ মানুষের জীবন অত্যন্ত সংবেদনশীলতা ও গভীর অন্তর্দৃষ্টির সাথে ফুটে উঠত। তাঁর অবিস্মরণীয় সৃষ্টিগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাঠকদের প্রভাবিত করেছে এবং ভারতের সাহিত্য ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে।”অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) শোকাতুর হৃদয়ে লিখেছেন, “বিশিষ্ট সাহিত্যিক মণি শংকর মুখোপাধ্যায়ের (শংকর) প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত।তাঁর চলে যাওয়া মানে বাংলা সাহিত্যাকাশের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন। আমি তাঁর পরিবার ও অগণিত গুণগ্রাহীদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।”
এক বর্ণময় সাহিত্য
জীবনশংকরের কলম ছিল জাদুকরী। তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’ (Chowringhee) বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক মাইলফলক। হোটেলের পেছনের জগতের রক্ত-মাংসের কাহিনী যেভাবে তিনি তুলে ধরেছিলেন, তা আজও পাঠকদের মনে গেঁথে আছে। এ ছাড়াও ‘জন অরণ্য’ (Jana Aranya), ‘সীমাবদ্ধ’ (Seemabaddha)-এর মতো অসাধারণ সব সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন তিনি, যা পরবর্তীকালে বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় (Satyajit Ray)-এর মাধ্যমে সেলুলয়েডের পর্দায় জীবন্ত হয়ে উঠেছিল।ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন প্রখ্যাত ব্যারিস্টার বারওয়েলের শেষ ক্লার্ক। সেই অভিজ্ঞতাই হয়তো তাঁর লেখায় এনে দিয়েছিল এক আশ্চর্য বাস্তবতা।
পেশাগত জীবনের জটিলতা আর সাধারণ মানুষের জীবনবোধ এই দুয়ের মিশেলে তিনি তৈরি করেছিলেন এক নিজস্ব গদ্যশৈলী।শোকাতুর পাঠকমহল শংকরের চলে যাওয়া মানে একটি যুগের অবসান। তিনি কেবল একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন কলকাতার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। তাঁর প্রয়াণে কেবল তাঁর পরিবার নয়, শোকস্তব্ধ বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অগণিত বাঙালি পাঠক।

