একসময় দুর্গাপুজোর অঞ্জলি দিতে যেতে হতো অন্য গ্রামে। নিজেদের গ্রামেও দুর্গাপুজো হবে, এমন স্বপ্ন দেখতেন ধুর্পার মহিলারা। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে ২০২৩ সালে একজোট হয়েছিলেন প্রায় ৭০-৮০ জন মহিলা। নিজেদের সরকারি ভাতার টাকা একত্র করে এবং গ্রামবাসীদের সাহায্য নিয়ে শুরু করেছিলেন দুর্গাপুজো। দেখতে দেখতে সেই পুজো এবার চতুর্থ বছরে পা দিল। আর্থিক সহায়তার পরিমাণ বাড়ায় এবার পুজোর বাজেটও বাড়ানোর পরিকল্পনা করেছেন উদ্যোক্তারা।
পূর্ব মেদিনীপুরের শহিদ মাতঙ্গিনী ব্লকের ধুর্পা গ্রামের এই পুজোর দায়িত্বে রয়েছে মহিলাদের তৈরি ‘মাতৃশক্তি’ পুজো কমিটি। প্রথম থেকেই সংসারের কাজ সামলে পুজোর যাবতীয় দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তাঁরা। কেউ বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করছেন, কেউ ব্যস্ত পুজোর সামগ্রী কেনাকাটায়। প্রতিমা তৈরি থেকে শুরু করে মণ্ডপ, ভোগ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন—সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন কমিটির সদস্যরা।
পুজো শুরুর সময় মহিলারা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের মাসিক ভাতার টাকা থেকে একাংশ জমিয়ে দুর্গাপুজোর আয়োজন করতেন। তখন মাসে ৫০০ টাকা করে পেতেন তাঁরা। পরে সেই অর্থের পরিমাণ বেড়ে ১০০০ এবং ১৫০০ টাকা হয়। বর্তমানে অন্নপূর্ণা যোজনায় মাসিক সহায়তার পরিমাণ ৩০০০ টাকা হওয়ায় পুজোর বাজেট বাড়ানোর আশাও দেখছেন উদ্যোক্তারা।
পুজো কমিটির সভাপতি নমিতা মাজি জানিয়েছেন, আর্থিক সহায়তার পরিমাণ বাড়ায় এবারের পুজোর বাজেটও বাড়তে পারে। গত বছর পুজোর খরচ ছিল তিন লক্ষ টাকার কিছু বেশি। এবার সেই বাজেট প্রায় চার লক্ষ টাকায় পৌঁছতে পারে বলে আশা করছেন তাঁরা। তবে কমিটির কয়েকজন সদস্য এখনও এই অর্থ পাননি বলেও জানিয়েছেন তিনি।
শুধু বাজেটই নয়, সময়ের সঙ্গে বেড়েছে পুজো কমিটির সদস্য সংখ্যাও। শুরুতে যেখানে ৭০-৮০ জন মহিলা ছিলেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় ১০০। তাঁদের সম্মিলিত উদ্যোগেই প্রতি বছর আরও বড় করে পুজোর আয়োজন করার চেষ্টা চলছে।
এবার দর্শনার্থীদের জন্য থাকছে পুতুলনাচ, যাত্রাপালা এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অষ্টমীর প্রীতিভোজে প্রায় দেড় থেকে দু’হাজার মানুষকে খাওয়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। দশমীতে সিঁদুর খেলা এবং মিষ্টিমুখের আয়োজনও করা হবে। উদ্যোক্তাদের আশা, এই আয়োজনের মাধ্যমে গ্রামের আরও বেশি মানুষকে উৎসবের আনন্দে সামিল করা যাবে।
জায়গার অভাবে রাস্তার ধারে ত্রিপল দিয়ে ঘেরা জায়গাতেই চলছে প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের কাজ। সীমিত পরিসর ও নানা বাধা সত্ত্বেও পুজোর প্রস্তুতিতে কোনও খামতি রাখতে চাইছেন না মহিলারা। শম্পা, পিঙ্কি-সহ কমিটির অন্যান্য সদস্যরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একের পর এক কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
ধুর্পার এই দুর্গাপুজো এখন আর শুধু ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রামের মহিলাদের কাছে এটি একজোট হয়ে কাজ করার, নিজেদের উদ্যোগে একটি সামাজিক পরিসর গড়ে তোলার উদাহরণ। সরকারি ভাতার টাকা, স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা এবং মহিলাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যে পুজোর সূচনা হয়েছিল, আজ তা গ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে পরিণত হয়েছে।


Recent Comments