পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের জন্য চালু হওয়া অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প নিয়ে নতুন করে একাধিক নিয়ম ও যোগ্যতার বিষয় স্পষ্ট করেছে প্রশাসন। এই প্রকল্পের আওতায় যোগ্য মহিলারা প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবেন। তবে আবেদন করলেই প্রত্যেকে এই সুবিধা পাবেন না। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত আয়, পারিবারিক আয়, পরিবারের সদস্যদের চাকরি এবং অন্যান্য কয়েকটি বিষয় যাচাই করার পরই চূড়ান্তভাবে ঠিক হবে কে এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।
২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী মহিলা বাসিন্দারা নির্দিষ্ট যোগ্যতা পূরণ করলে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সুবিধা পেতে পারেন। শুধু সাধারণ আবেদনকারীরাই নন, প্রতিবন্ধী ভাতা বা PM-Kisan-এর মতো প্রকল্পের উপভোক্তারাও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে এই প্রকল্পের ৩,০০০ টাকা পেতে পারেন। গ্রামীণ এলাকার মহিলাদের ক্ষেত্রেও কিছু ক্ষেত্রে বাড়ি ও জমির মাপকাঠিতে ছাড় রাখা হয়েছে। তিনটির বেশি ঘর থাকলেও তাঁরা যোগ্য হতে পারেন। এমনকি ৫০ ডেসিমেলের বেশি জমি থাকলেও গ্রামীণ এলাকার আবেদনকারীকে শুধুমাত্র সেই কারণে বাদ দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে।
বিধবা ভাতার উপভোক্তারাও এই প্রকল্পের আওতায় আসতে পারবেন। বর্তমানে যাঁরা ১,৫০০ টাকা করে বিধবা ভাতা পান, তাঁরা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের মাধ্যমে মোট ৩,০০০ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পেতে পারেন।
তবে প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। কোনও মহিলার নিজের মাসিক আয় ১০,০০০ টাকা বা তার বেশি হলে তিনি অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ৩,০০০ টাকা পাবেন না। একইভাবে, পরিবারের বার্ষিক আয় ১২ লক্ষ টাকার বেশি হলেও সংশ্লিষ্ট পরিবার এই প্রকল্পের সুবিধা থেকে বাদ পড়বে। পরিবারের স্বামী বা অন্য কোনও সদস্য কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের অধীন, পঞ্চায়েত, পুরসভা কিংবা সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী চাকরিতে থাকলেও আবেদনকারী অযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারেন।
অন্য কোনও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রেও যোগ্যতা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি জমির পরিমাণের ক্ষেত্রেও গ্রাম ও পুরনিগম এলাকার জন্য আলাদা নিয়ম রাখা হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় ৫০ ডেসিমেলের বেশি জমি থাকলেও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে পুরনিগম এলাকার বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে ৫০ ডেসিমেলের বেশি জমি থাকলে তাঁরা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের সুবিধা পাবেন না।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা, ভিন্রাজ্য বা ভিন্দেশ থেকে আসা অস্থায়ী বাসিন্দাদের এই প্রকল্পের সুবিধা দেওয়া হবে না বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ আবেদনকারীর বাসস্থান, নাগরিকত্ব ও অন্যান্য নথিপত্রও যাচাই করা হবে।
অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা ধাপে ধাপে উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে। প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী, আগস্ট মাসের টাকা ১৭ তারিখ থেকে দেওয়া শুরু হওয়ার কথা। জুন ও জুলাই মাসে যাঁরা ইতিমধ্যেই টাকা পেয়েছেন, তাঁদের পাশাপাশি নতুন আবেদনকারীদের মধ্যেও যাঁদের যাচাই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে এবং আবেদনে কোনও ত্রুটি পাওয়া যায়নি, তাঁদের টাকা দেওয়া হবে।
তবে আগস্ট মাসে আবেদন করা সকলেই টাকা পাবেন না। ১০ জুলাই পর্যন্ত যাঁরা আবেদন করেছেন এবং যাঁদের আবেদনে কোনও সমস্যা পাওয়া যায়নি, তাঁদেরই আগস্টের কিস্তি পাওয়ার কথা। অন্যদিকে, ১১ থেকে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে যাঁরা আবেদন করেছেন, তাঁদের যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও সময় লাগবে। সেই কারণে তাঁদের আগস্টে টাকা না এসে পরবর্তী পর্যায়ে টাকা দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। প্রশাসনের তরফে বলা হয়েছে, এই আবেদনগুলির যাচাই শেষ হওয়ার পর সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে তাঁদের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হতে পারে।
অন্যদিকে, অক্টোবর মাস থেকে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সূচি চালু করার কথা জানানো হয়েছে। প্রতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, এই প্রকল্পকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াতে পারে। তাই গুজবে কান না দিয়ে সরকারি নির্দেশিকা ও যাচাই করা তথ্যের উপর নির্ভর করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের মাধ্যমে মাসে ৩,০০০ টাকা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রত্যেক আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট যোগ্যতার মাপকাঠি পূরণ করতে হবে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আয়, পরিবারের সদস্যদের চাকরি, জমি-সম্পত্তি, বসবাসের তথ্য এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধার বিষয় যাচাই করার পরই চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হবে কে এই প্রকল্পের টাকা পাবেন এবং কার আবেদন বাতিল হবে।


Recent Comments